সেই দিনের কথা কুরআন এমন এক নীরবতায় এঁকেছে, যেখানে মানুষের মুখ থাকবে, কিন্তু বাক্য থাকবে না; স্মৃতি থাকবে, কিন্তু সান্ত্বনার ভাষা থাকবে না। সূরা আল-কাসাসের এই আয়াতে বলা হচ্ছে, অতঃপর তাদের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যাবে, আর তারা একে অন্যকে জিজ্ঞাসাবাদও করতে পারবে না। দুনিয়ায় মানুষ কত প্রশ্নে বাঁচে—কে কেন, কীভাবে, কার জন্য, কার বিরুদ্ধে, কার সাথে—কিন্তু কিয়ামতের এক মহাক্ষণে সেই সব প্রশ্নের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন সময়ের মতোই কথাও থেমে যাবে; অপরাধী আর অপরাধকে ঢাকতে পারবে না, আত্মীয় আর আত্মীয়কে রক্ষা করতে পারবে না, দল আর দলকে ভরসা দিতে পারবে না।
এই আয়াতের আলোকে মনে পড়ে আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের হিসাবের চেয়ে কত বিশাল, আর মানুষের অহংকার কত ক্ষণস্থায়ী। সূরা আল-কাসাসে মূসা আলাইহিস সালামের জীবন, ফিরআউনের জুলুম, বনি ইসরাইলের দুর্দশা, কারূনের সম্পদের অহংকার—সবকিছুই যেন এই এক সত্যের দিকে ইশারা করে: ক্ষমতা স্থায়ী নয়, সম্পদ নিরাপত্তা নয়, আর দমন-পীড়ন শেষ পর্যন্ত কোনো আশ্রয় দেয় না। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় নিজেকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ভাবেছিল, সে-ই সেদিন জবাবহীন হবে। যে সমাজ অন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়েছিল, সে সমাজ সেদিন পরস্পরকে পরিচয় দেবে বটে, কিন্তু উদ্ধার দিতে পারবে না।
এই আয়াতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো এমন প্রমাণিত শানে নুযূল বর্ণিত নেই; তবে এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপট কিয়ামতের দৃশ্য, যেখানে মানুষকে আল্লাহর সামনে একাকী দাঁড়াতে হবে। এখানে আমাদের হৃদয়কে কাঁপিয়ে ওঠার মতো বার্তা হলো—দুনিয়ার ব্যস্ত কথাবার্তার ভেতরেও একদিন আসছে, যেদিন ন্যায়বিচার ছাড়া আর কিছুই কাজ করবে না। আজ যে মানুষ সত্যকে এড়িয়ে চলছে, কাল সে নিজেকেই প্রশ্ন করতে পারবে না; আর আজ যে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তার নীরবতাও সেদিন রহমতের ভাষা হয়ে উঠতে পারে।
কিয়ামতের সে দিন মানুষ অনেক কিছু নিয়ে উপস্থিত হবে—মুখে দাবি, হৃদয়ে অস্বস্তি, আমলের ভার, স্মৃতির ধুলো। কিন্তু কুরআন বলছে, এক সময় আসবে যখন সব কথাবার্তা হঠাৎ থেমে যাবে; এমন এক নীরবতা নেমে আসবে যে, প্রশ্ন করার শক্তিও নিভে যাবে। এটি কেবল ভাষার বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়, এটি ভরসার সব মিথ্যা দরজার বন্ধ হয়ে যাওয়া। দুনিয়ায় মানুষ কত সহজে প্রশ্ন করে—কেন আমি, কেন এখন, কেন এভাবে? কিন্তু সেদিন যখন হুকুমের সামনে সব পর্দা সরে যাবে, তখন প্রশ্ন থাকবে না, থাকবে শুধু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্য। তখন বোঝা যাবে, মানুষের পরিকল্পনা কত ক্ষুদ্র, আর আল্লাহর ফয়সালা কত নিখুঁত।
এই আয়াত আমাদের আজই জাগিয়ে তোলে। কারণ দুনিয়ায় আমরা একে অন্যকে অনেক প্রশ্ন করি, কিন্তু নিজের নফসকে খুব কম প্রশ্ন করি। আমরা বিচার চাই, কিন্তু নিজেকে বিচার করতে ভয় পাই; সত্য জানতে চাই, কিন্তু সত্যের সামনে দাঁড়াতে কেঁপে উঠি। অথচ সেই দিনের নীরবতা এই দুনিয়ার জন্যই এক সতর্কতা—যে কথা আজ বলা যায়, যে তাওবা আজ করা যায়, যে অশ্রু আজ ঝরানো যায়, তা কাল আর পাওয়া যাবে না। তাই আজই আল্লাহর দিকে ফিরে আসা দরকার, আজই অহংকার ভেঙে ফেলা দরকার, আজই অন্তরকে সেই এক মহাসত্যের সামনে নত করা দরকার: মানুষ প্রশ্ন করবে, কিন্তু উত্তর পাবে একমাত্র আল্লাহর বিচারেই; আর যখন সেই বিচার শুরু হবে, তখন ভাষা নয়, আমলই হবে মানুষের পরিচয়।
কিয়ামতের সেই দিনে মানুষের মুখে শব্দ থাকবে, কিন্তু কথার শক্তি থাকবে না; জবান থাকবে, কিন্তু জবাব থাকবে না। সূরা আল-কাসাসের এই আয়াত যেন আমাদের হৃদয়ের দরজায় ধীরে ধীরে কড়া নাড়ে—অতঃপর তাদের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যাবে, আর তারা একে অন্যকে জিজ্ঞাসাবাদও করতে পারবে না। দুনিয়ায় আমরা কত সহজে অন্যের দিকে তাকিয়ে বাঁচি, কত সহজে পরিবার, দল, মর্যাদা, সম্পদ, পরিচয়—এসবকে ঢাল বানাই; কিন্তু সেই মহাদিবসে কোনো পরিচয়ই আর আশ্রয় হবে না। সেখানে প্রশ্ন থাকবে, কিন্তু প্রশ্ন করার সাহস থাকবে না; স্মৃতি থাকবে, কিন্তু সান্ত্বনার ভাষা থাকবে না।
ফিরআউন ও কারূনের কাহিনি এই নীরবতার দিকে আমাদের আরও গভীরভাবে তাকাতে শেখায়। একজন ক্ষমতার নেশায় মানুষকে পিষে ফেলেছিল, আরেকজন সম্পদের অহংকারে নিজেকেই বড় ভেবেছিল; কিন্তু উভয়ের শেষ পরিণতি আমাদের জানিয়ে দেয়—আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের চাতুর্যের চেয়ে অসীম, আর তাঁর সামনে কারও জোর চলে না। সমাজ যখন জুলুমকে স্বাভাবিক করে, যখন শক্তিশালী নিজের ভুল ঢাকতে থাকে, যখন দুর্বলের কান্না কারও কানে পৌঁছায় না, তখন এই আয়াত যেন সতর্ক ঘণ্টার মতো বেজে ওঠে: একদিন এমন আসবে, যখন কেউ কারও হয়ে কথা বলতে পারবে না। তখন সকল পর্দা সরে যাবে, এবং মানুষের অন্তরের প্রকৃত রং প্রকাশ পাবে।
এই আয়াত আমাদের আত্মসমালোচনার দিকে ডাকে—আজ যে মুখে আমরা অন্যকে বিচার করি, কাল সেই মুখেই যদি জবাব দিতে না পারি? আজ যে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে আমরা গুনাহকে হালকা করি, কাল সেই সম্পর্কও কি আমাদের বাঁচাতে পারবে? না, পারবে না। তাই ভয় ও আশা—দুই-ই হৃদয়ে জাগতে হবে: আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয়, আর তাঁর রহমতের আশায় ফিরে আসার তাড়না। যে হৃদয় আজই নরম হয়, যে চোখ আজই নিজের হিসাব নেয়, সেই হৃদয়ই একদিন সেই ভয়ংকর নীরবতার মধ্যে আল্লাহর করুণার দিকে তাকাতে পারবে। সূরা আল-কাসাস আমাদের শেখায়—মানুষের কাহিনি শেষ হয়, কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা বাকি থাকে; আর শেষ বিচারে নীরবতাই বলে দেবে, কে নিজেকে চিনেছিল, আর কে নিজের অহংকারে হারিয়ে গিয়েছিল।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, মানুষ আসলে কতটা নির্ভরশীল—নিজের ভাষার ওপরও নয়, নিজের সম্পর্কের ওপরও নয়, এমনকি নিজের ব্যাখ্যার ওপরও নয়। সেদিন ফিরআউন তার শক্তি দিয়ে, কারূন তার ধন দিয়ে, আর সাধারণ মানুষ তার অভ্যাস দিয়ে কিছুই বলতে পারবে না। যে জিহ্বা দুনিয়ায় অহংকারে কেঁপে উঠত, যে মুখ অন্যায়কে সাফাই দিত, যে কণ্ঠ সত্যকে অবহেলা করত—সবই স্তব্ধ হয়ে যাবে। তখন প্রশ্ন থাকবে, কিন্তু প্রশ্নকারী থাকবে অসহায়; অপরাধ থাকবে, কিন্তু অজুহাত থাকবে না; স্মৃতি থাকবে, কিন্তু পালানোর পথ থাকবে না।
সূরা আল-কাসাস আমাদের শেখায়—আল্লাহর পরিকল্পনা কখনো মানুষের অনুমানের মধ্যে বন্দী হয় না। মূসা আলাইহিস সালামকে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অথচ সেখান থেকেই ফিরআউনের মহলের ভেতর দিয়ে সত্যের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। কারূনের ধন তাকে বাঁচাতে পারেনি, ফিরআউনের সাম্রাজ্য তাকে রক্ষা করতে পারেনি, আর কিয়ামতের সেই দিনে কারও জিজ্ঞাসাও কাউকে মুক্তি দিতে পারবে না। তাই আজই সেই নীরব দিনের জন্য প্রস্তুত হও; আজই অন্তরকে নরম করো; আজই তাওবার দরজা দিয়ে ফিরো। কারণ যেদিন কথাবার্তা থেমে যাবে, সেদিন শুধু একটিই সম্পদ কাজ দেবে—আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসা বান্দার হৃদয়।