কিয়ামতের সেই মুহূর্তটি কেমন হবে, যখন আল্লাহ নিজেই মানুষকে ডেকে জিজ্ঞেস করবেন—তোমরা রসূলদের কী জবাব দিয়েছিলে? এই একটি প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্য: মানুষ দুনিয়ায় যা-ই করুক, শেষ পর্যন্ত তাকে সত্যের সামনে দাঁড়াতেই হবে। ক্ষমতা তখন কথা বলবে না, সম্পদ সঙ্গ দেবে না, সামাজিক মর্যাদা কোনো ঢাল হবে না। থাকবে শুধু হৃদয়ের অবস্থান—রসূলের আহ্বান শুনে সে মাথা নত করেছিল, নাকি অস্বীকারের পথে হাঁটছিল। সূরা আল-কাসাসের প্রবাহে এই আয়াত যেন হঠাৎ করে আকাশ খুলে দেয়, আর মানুষকে তার চূড়ান্ত জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করায়।
এই সূরার বৃহৎ কাহিনিচিত্রে মূসা আলাইহিস সালামের জীবন, ফিরআউনের ঔদ্ধত্য, আর কারূনের ধন-সম্পদের বিভ্রম আমাদের সামনে এমন এক পৃথিবী তুলে ধরে, যেখানে বাহ্যিক শক্তি খুব উজ্জ্বল মনে হয়, কিন্তু অন্তরে সত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দায় আরও ভয়াবহ। মূসার কাহিনি আমাদের শেখায়, আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের চোখে বহুবার বিপর্যয়ের মতো দেখা দিলেও সেটিই আসলে মুক্তির পথ তৈরি করে। ফিরআউন নিজেকে বড় ভেবেছিল, কারূন নিজেকে নিরাপদ ভেবেছিল, কিন্তু কিয়ামতের দিনে তাদের মতো সবার কাছেই প্রথম প্রশ্নটি হবে—রসূলদের কী জবাব দিয়েছিলে? এখানে রসূলের দাওয়াত মানে শুধু একটি বার্তা শোনা নয়; তা মানে আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য আসার পর তার সামনে নত হওয়া, নিজের অহংকার ভেঙে দেওয়া, এবং জীবনের দিক বদলে ফেলা।
এই আয়াতের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ও সুপ্রতিষ্ঠিত আসবাবুন নুযূল নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়া যায় না; তাই একে কুরআনের সার্বজনীন সতর্কবাণী হিসেবেই গ্রহণ করা উচিত। এটি শুধু প্রাচীন কোনো জাতির গল্প নয়, বরং প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য হৃদয় কাঁপানো প্রশ্ন—আমরা আল্লাহর বার্তাবাহকদের ডাকে কী সাড়া দিয়েছি? আমাদের নীরবতা, আমাদের অজুহাত, আমাদের বিলম্ব, আমাদের বেছে নেওয়া অবজ্ঞা—সবই একদিন প্রকাশ পাবে। সূরা আল-কাসাসের আলোয় এই প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে, কারণ এখানে ইতিহাস শুধু স্মৃতি নয়; ইতিহাস হয়ে ওঠে আয়না। আর সেই আয়নায় আমরা দেখতে পাই, আল্লাহর পরিকল্পনা কখনো তাড়াহুড়োর নয়, কিন্তু কখনো ব্যর্থও নয়; তিনি সময় নেন, তবে কাউকে ভুলে যান না।
যেদিন আল্লাহ নিজেই ডাক দেবেন, সেদিন মানুষের সব ব্যস্ততা যেন এক মুহূর্তে ছিঁড়ে যাবে। দুনিয়ায় মানুষ কত রকম উত্তর সাজায়—অজুহাত, যুক্তি, প্রতিবাদ, ভান, আত্মপক্ষসমর্থন। কিন্তু সেদিন প্রশ্ন হবে খুব সোজা, খুব নির্মম, খুব সত্য: তোমরা রসূলদের কী জবাব দিয়েছিলে? এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায়, মানুষের আসল পরিচয় তার ভাষণে নয়, তার সাড়া-দানে। সত্য যখন আহ্বান করেছিল, তখন হৃদয় কি নরম হয়েছিল, নাকি অহংকারে পাথর হয়ে গিয়েছিল—এটাই হবে হিসাবের কেন্দ্রবিন্দু। সূরা আল-কাসাসের এই আয়াত আমাদের শেখায়, আল্লাহর দরবারে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো না ক্ষমতা, না উত্তরাধিকার, না অর্জন; সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তোমার অন্তর কি হেদায়েতের ডাকে সাড়া দিয়েছিল।
যেদিন আল্লাহ ডেকে বলবেন, “তোমরা রসূলদের কী জবাব দিয়েছিলে?”—সেই দিন মানুষের সমস্ত অজুহাতের গায়ে আগুন ধরে যাবে। দুনিয়ায় আমরা কত কথা বলি, কত ব্যাখ্যা দাঁড় করাই, কতবার সত্যকে সাময়িকভাবে সরিয়ে রেখে নিজের সান্ত্বনা গড়ে তুলি; কিন্তু কিয়ামতের ময়দানে একটাই প্রশ্ন সবকিছুকে নগ্ন করে দেবে: আল্লাহর পাঠানো সত্যের সামনে তুমি কী দাঁড় করেছিলে? এই প্রশ্নে ধরা পড়ে হৃদয়ের আসল মানচিত্র। কে নত হয়েছিল, কে দ্বিধায় ছিল, কে অহংকারে মুখ ফিরিয়েছিল—সব প্রকাশ পেয়ে যাবে। তখন ক্ষমতা থাকবে না, দল থাকবে না, জনমত থাকবে না; থাকবে শুধু মানুষের অন্তরের সেই জবাব, যা সে দুনিয়ায় আল্লাহর ডাকে দিয়েছিল।
সূরা আল-কাসাসের বিস্তৃত সুরে মূসা আলাইহিস সালামের জীবন আমাদের দেখায়, আল্লাহর পরিকল্পনা বহুবার মানুষের চোখে ভাঙনের মতো দেখা দেয়, অথচ ভেতরে ভেতরে সেটিই মুক্তির পথ তৈরি করে। ফিরআউন জুলুমের শিখরে উঠে ভেবেছিল সে ইতিহাসকে বেঁধে ফেলেছে; কারূন সম্পদের ভারে মাটি ভুলে গিয়েছিল; আর সাধারণ মানুষ ভয়, লোভ, নীরবতা আর সুবিধার মধ্যে দুলেছে। কিন্তু এই আয়াত সেই দুনিয়াবি শব্দের ওপরে কিয়ামতের প্রশ্নকে বসিয়ে দেয়। রসূলদের উত্তর দেওয়া মানে কেবল মুখে কিছু বলা নয়—সত্যকে গ্রহণ করা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো, আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া, আর নিজের অহংকারকে ভেঙে মাটিতে নামিয়ে আনা। যে সমাজ রসূলের আহ্বানকে হালকা করে, সে সমাজ বাহ্যিকভাবে যতই উজ্জ্বল হোক, ভেতরে ভেতরে জবাবদিহির আগুন জমা করে রাখে।
এই আয়াত তাই ভয়ের সঙ্গে আশা-ও জাগায়। ভয়ের, কারণ আমরা কেউই সেই দিনের প্রশ্ন থেকে পালাতে পারব না; আশার, কারণ আজও দরজা খোলা আছে, আজও আত্মসমালোচনা সম্ভব, আজও হৃদয় ফিরতে পারে। এখনই যদি আমরা নিজেদের জিজ্ঞেস করি—আল্লাহর সত্য, কুরআনের আহ্বান, ন্যায় ও তাওহীদের ডাকের সামনে আমি কী জবাব দিচ্ছি?—তবে কিয়ামতের প্রশ্ন কিছুটা হলেও দুনিয়ায় নরম হয়ে আসে। আল্লাহর কাছে ফিরে আসার অর্থ পরাজয় নয়; বরং সেটিই মুক্তি। মূসা, ফিরআউন, কারূন—সবাই আমাদের সামনে এই শিক্ষা রেখেছে যে মানুষের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত শক্তির নয়, জবাবের ইতিহাস। আর সেই জবাবের দিন যত কাছে আসে, তত বেশি স্পষ্ট হয়: সফল সে-ই, যে দুনিয়ায় সত্যের কাছে মাথা নত করেছে।
কিয়ামতের সেদিন আল্লাহ যখন ডাক দেবেন—“তোমরা রসূলদের কী জবাব দিয়েছিলে?”—তখন মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় পর্দাটি ছিঁড়ে যাবে। দুনিয়ায় আমরা যত অজুহাতই গড়ে তুলি, যত ব্যস্ততার আড়ালে সত্যকে সরিয়ে রাখি, সেই মুহূর্তে কিছুই আর টিকবে না। প্রশ্নটি শুধু ভাষার উত্তর চায় না; চায় হৃদয়ের সাক্ষ্য। রসূল এসেছিলেন, সত্য পৌঁছে গিয়েছিল, আলোর পথ দেখানো হয়েছিল—এখন হিসাব হবে, সেই আলোকে আমরা গ্রহণ করেছিলাম, না কি অহংকারের অন্ধকারে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম।
সূরা আল-কাসাসের বিস্তৃত আখ্যানের মাঝে এই প্রশ্নটি যেন সব কাহিনির মর্মস্থল। মূসা আলাইহিস সালাম, ফিরআউন, কারূন—সকলেই আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় একটিই বাস্তবতা: আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের চোখে কখনো ভাঙনের মতো, কখনো বিলম্বের মতো, কখনো নীরবতার মতো দেখা দেয়; কিন্তু তার ভিতরে থাকে অপরাজেয় হিকমত। ফিরআউনের শক্তি তাকে বাঁচাতে পারেনি, কারূনের ধন তাকে উঁচুতে তুললেও ডুব থেকে রক্ষা করেনি। আর মূসার পথ দেখায়, দুনিয়ার মানচিত্রে যে মানুষকে দুর্বল মনে হয়, তাকেই আল্লাহ তাঁর নিদর্শনের বাহক বানাতে পারেন। শেষ পর্যন্ত জয়ের নাম নয়, সমর্পণের নামই সত্য।
আজ এ আয়াত আমাদের থামিয়ে দেয়। আমাদের কাছে প্রশ্ন আসে—রসূলদের আহ্বানের জবাবে আমরা কী দিয়েছি? অনুসরণ, না অবহেলা? নম্রতা, না আত্মগর্ব? এই প্রশ্নের উত্তরে কোনো পরিচয়পত্র চলবে না, কোনো সম্পদ কাজ করবে না, কোনো পদমর্যাদা সাক্ষ্য দেবে না। তাই আজই হৃদয়কে নরম হতে দিন, সত্যের কাছে ফিরে আসুন, নিজের ভেতরের ফিরআউনকে চিনে নিন, কারূনের মোহকে ভেঙে ফেলুন, আর মূসার পথে আল্লাহর ওপর ভরসা করুন। যে দিন আল্লাহ ডাকবেন, সেদিন নত হতে পারাই হবে মুক্তির প্রথম চিহ্ন।