সূরা আল-কাসাসের এই আয়াতে মূসা আলাইহিস সালামের জীবনের এক ঝড়ো মুহূর্ত ধরা পড়ে। দু’জনের সংঘর্ষে তিনি যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এগিয়ে গেলেন, তখনই এক ঝলকে প্রকাশ পেল পূর্বের সেই ঘটনা, যে স্মৃতি তাঁর জীবনের ওপর ছায়া ফেলেছিল। যে মানুষটি শাস্তি দিতে উদ্যত হয়েছিল, সে হঠাৎ বলল—তুমি কি আমাকেও সেইভাবে হত্যা করতে চাও, যেমন গতকাল এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে? এই বাক্য শুধু একটি ভয়ভীতির উচ্চারণ নয়; এটি একেবারে নগ্নভাবে ক্ষমতার ভাষা, আতঙ্কের ভাষা, এবং এমন এক সমাজের ভাষা যেখানে সত্যের পাশে দাঁড়ানো মানুষকেও অপরাধীর আসনে বসিয়ে দেওয়া হয়।

এখানে কোনো নির্দিষ্ট পৃথক শানে নুযূলের প্রয়োজন নেই; কুরআনের নিজের বর্ণনাই এই ঘটনার বিস্তার ও তাৎপর্য খুলে দেয়। মূসা যখন দু’পক্ষের একজনের পক্ষে ন্যায়ের সহায়তায় এগোচ্ছেন, তখন তাঁর হাতে লুকিয়ে থাকা অতীতের ভুল আবার সামনে চলে আসে। আর সেই ব্যক্তি মূসাকে ‘জাব্বার’—পৃথিবীতে স্বৈরাচারী, বলপ্রয়োগকারী—হতে চাওয়ার অভিযোগ করে। কত করুণ এই মানবস্বভাব! যে অন্যায় করছে, সে-ই প্রতিরোধকারীকে জুলুমের প্রতীক বানাতে চায়। যে মেরেছে, সে-ই এখন ন্যায়বিচারের আগুনকে ক্ষমতার লোভ বলে অপবাদ দেয়। হৃদয় কেঁপে ওঠে, কারণ সত্যের পথে থাকা অনেক সময় এমনই: মানুষ তোমার নিয়তিকে নয়, তোমার ভুলকে ধরে বিচার করতে চায়।

কিন্তু এই আয়াতের গভীরে আছে আল্লাহর পরিকল্পনার মৃদু অথচ অমোঘ স্রোত। মূসার জীবন কেবল এক মুহূর্তের উত্তেজনা দিয়ে পড়া যায় না; তা তাকদিরের দীর্ঘ পথ। তাঁর এক ভুল, তাঁর এক ভয়, তাঁর চারপাশের সন্দেহ—সবকিছুই আল্লাহর কুদরতের ভেতর এমনভাবে গাঁথা, যেন নবীর জীবন মানুষকে শেখায়: সত্যের পথে চলতে গেলে অতীতের ছায়া, সমাজের অভিযোগ, এবং শাসকের রোষ—সবই পরীক্ষা হয়ে আসে। এই আয়াত আমাদের বলে, ন্যায়কে রক্ষা করতে গিয়ে কখনো মানুষকে জাব্বার বলা হবে, আবার কখনো মুছতে না পারা স্মৃতির দায় টেনে আনা হবে; কিন্তু আল্লাহর চোখে বান্দার পথ ঠিক হয় তাঁর ইচ্ছা ও হিকমতের মাধ্যমে। মূসার এই মুহূর্তটি তাই কেবল একটি সংঘর্ষের দৃশ্য নয়, বরং এক নবীর জীবনে আল্লাহর নির্ধারিত মোড়ের দরজা।

একটি মুহূর্তে কী বিস্ময়করভাবে মানুষ নিজের মুখোশ খুলে ফেলে। মূসা আলাইহিস সালাম যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে এগিয়ে গেলেন, তখনই সেই মুখে উঠে এলো ভয়ের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ—“তুমি কি আমাকেও হত্যা করতে চাও?” কত অদ্ভুত এই পৃথিবী: যে বাতিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, সে-ই সত্যকে ভয়ের মুখোশ পরিয়ে অভিযুক্ত করে; যে নিজের বুকে অহংকার লালন করছে, সে-ই অন্যকে বলে স্বৈরাচারী। এ যেন মানব-ইতিহাসের পুরনো রোগ—ক্ষমতা নিজের দোষ ঢাকতে প্রতিরোধকে অপরাধ বানায়। আয়াতটি আমাদের শেখায়, জুলুম কেবল আঘাতের নাম নয়; জুলুম হচ্ছে এমন এক অন্ধকার, যেখানে ন্যায়ের দিকে এগিয়ে আসা মানুষকেও সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।

আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, এখানে মূসার এক পূর্বের ঘটনার ছায়া তাঁর জীবনের ওপর ফিরে আসে। আল্লাহর তাকদিরে কখনো কখনো একটি ভুল মুহূর্তও ভবিষ্যতের দরজায় কঠিন নকশার মতো দাগ কেটে যায়; কিন্তু সেই দাগই শেষ কথা নয়। নবীজীবন আমাদের এটাই শেখায়—অতীতের ভুলের ভার বহন করতে হয়, কিন্তু আল্লাহর রহমত সেই ভারকে পথের পাথেয় বানিয়ে দেন। মূসা ছিলেন অপরাধী নন, তবু তাঁর জীবনে অস্থিরতা নেমে এল; কারণ আল্লাহ কখনো বান্দাকে এক মুহূর্তের ভেতরেই এমন জায়গায় দাঁড় করান, যেখানে সে বুঝে যায় শক্তির আসল মানে ঘুষি নয়, বরং আত্মসংযম; আসল বিজয় প্রতিহিংসা নয়, বরং সত্যের জন্য দৃঢ় থাকা।
এই আয়াতে স্বৈরাচারের অভিযোগের আড়ালে এক গভীর আধ্যাত্মিক সত্য ঝলসে ওঠে: মানুষ যখন ন্যায়ের পথে হাঁটে, তখন দুনিয়ার চোখে সে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে; কিন্তু আল্লাহর কাছে ভয়ংকর হলো সেই হৃদয়, যেটি জুলুমকে স্বাভাবিক মনে করে। মূসার জীবনে এটি কেবল একটি উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা নয়, বরং তাকদিরের সূক্ষ্ম অঙ্কন—যেখানে ভয়, শত্রুতা, স্মৃতি, এবং আল্লাহর গোপন পরিকল্পনা এক সুতোয় গাঁথা। আমাদের জীবনেও এমন কত ক্ষণ আসে, যখন আমরা ভাবি সবকিছু ভেঙে গেল; অথচ সেখানেই হয়তো রব আমাদের জন্য নতুন দরজা খুলে দিচ্ছেন। যে আল্লাহ মূসার পায়ের নিচে কাঁপতে থাকা পথকেও নবুওয়তের সফরে বদলে দিতে পারেন, তিনি আমাদের তওবা, ভাঙন, সংকোচ আর দুঃখকেও নিজের হিকমতের আলোয় নতুন অর্থ দিতে পারেন।

মূসা আলাইহিস সালাম যখন সেই সংঘাতে ন্যায়ের পক্ষে হাত বাড়ালেন, তখনই অতীতের এক ক্ষত হঠাৎ সামনে উঠে এল। গতকালের ভুল আজ আর শুধু একটি ঘটনা নয়; তা এখন এক স্মৃতি, যা তাঁর জীবনের পথকে নতুন করে কাঁপিয়ে দিল। এই আয়াতে আমরা দেখি, কেমন করে মানুষের সামান্য এক মুহূর্তও ইতিহাস হয়ে যায়, আর সেই ইতিহাস আবার নতুন পরীক্ষার দরজায় দাঁড় করিয়ে দেয়। যে সমাজে অন্যায় শক্তিশালী, সেখানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষকেই সহজে ‘জাব্বার’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। অথচ এই অভিযোগের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ক্ষমতার ভয়, আত্মরক্ষার হীন চতুরতা, এবং ন্যায়ের মুখ দেখার অসহ্যতা।

এখানে মূসার জীবনের ভেতর দিয়ে আমাদের অন্তরও জিজ্ঞাসার মুখে দাঁড়ায়। আমরা কি ন্যায়ের জন্য এগোই, নাকি নিজের ক্রোধকে ধর্মের বেশে সাজাই? আমরা কি অন্যের ভুল দেখলেই নিজেকে নিরাপদ ভাবি, নাকি নিজের আমলকেও আল্লাহর সামনে জবাবদিহির ভারে কাঁপিয়ে তুলি? একজন নবীও যখন অতীতের ঘটনার ছায়া বয়ে বেড়ান, তখন আমাদের অহংকার কোথায় দাঁড়ায়? এই আয়াত শেখায়, মানুষের দৃষ্টি কত অল্প, আর আল্লাহর পরিকল্পনা কত বিস্তৃত। যে ভুলকে মানুষ থামাতে চায়, কখনো তা-ই আল্লাহর হিকমতে রূপান্তরিত হয়ে বান্দাকে আরও বিনম্র, আরও সজাগ, আরও সত্যনিষ্ঠ করে তোলে।

তাই এই কথা হৃদয়ে রাখতে হয়: আত্মসমালোচনা মুমিনের আলো, আর অহংকার ফিতনার আগুন। মূসা আলাইহিস সালামের জীবনে এই ঝড় এমন এক পথে মোড় নিল, যেখানে তিনি শুধু একটি জাতির মুক্তির দিকে নয়, নিজের অন্তরের পরিশুদ্ধির দিকেও এগোতে থাকলেন। আল্লাহ কখনো বান্দাকে তার এক ভুল দিয়ে শেষ করে দেন না; যদি সে ফিরতে জানে, তবে সেই ভুলও তাওবার সিঁড়ি হয়ে যায়। এই আয়াতের গভীরে দাঁড়িয়ে আমরা অনুভব করি—মানুষের ভাষা দোষারোপ করে, কিন্তু আল্লাহর ভাষা পথ দেখায়; মানুষের সমাজ ভীত করে, কিন্তু আল্লাহর তাকদির আশ্রয় দেয়। যাঁর দিকে ফেরা ছাড়া আর কোনো নিরাপদ গন্তব্য নেই, তাঁর কাছেই অবশেষে মূসার মতো আমরাও ফিরে যেতে চাই।

কত করুণ এই দৃশ্য—এক মুহূর্তে সত্যের পাশে দাঁড়াতে গিয়েই মূসা আলাইহিস সালামকে আবার তাঁর অতীতের ছায়ার মুখোমুখি হতে হলো। মানুষ ভুলে না; সমাজ ভুলে না; আর ক্ষমতার চোখ তো কখনোই ভুলে না। যে হৃদয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেঁপে ওঠে, তাকেই তারা ভয়ংকর বলে; যে হাত জুলুমের দিকে ওঠে, সেই হাতই আবার ন্যায়পরায়ণকে “স্বৈরাচারী” বলে দাগিয়ে দেয়। এ হলো দুনিয়ার চিরচেনা উল্টো মানচিত্র—যেখানে সংশোধনকারীকে অপরাধী বানানো হয়, আর ফ্যাসাদকে শৃঙ্খলা বলে চালানো হয়। কিন্তু কুরআন আমাদের শেখায়, মানুষের মুখে ওঠা অভিযোগই সত্যের মাপকাঠি নয়; আল্লাহর চোখে কী আছে, সেটাই চূড়ান্ত।
এই আয়াত মূসার জীবনের এক গভীর মোড়ও দেখায়। তিনি তখনও নবুয়তের পথে প্রকাশিত নন; তবু আল্লাহ তাঁর জীবনকে এমন সব ঘটনার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলছেন, যা পরে হবে হিদায়াতের বাহন। মানুষ যখন ভাবে, ঘটনা তার হাতে; তখন আসলে তাকদির নীরবে নিজের পথ লেখে। একদিনের ভুল, একদিনের আতঙ্ক, একদিনের পালিয়ে যাওয়া—সবই আল্লাহর পরিকল্পনায় এমনভাবে যুক্ত হয় যে, শেষ পর্যন্ত মিশরের সিংহাসনের অহংকারও কাঁপে, আর ফেরাউনের প্রাসাদের ভিতরেই মূসার সত্য উচ্চারিত হয়। তাই এই আয়াত আমাদের শেখায়, আমরা যা হারিয়ে ফেলেছি বলে কাঁদি, আল্লাহ সেটাকেও রাহমতের দরজায় রূপ দিতে পারেন; আমরা যা ভাঙন মনে করি, তা-ই হতে পারে তাওহীদের নির্মাণ।
অতএব অন্তরকে জাগিয়ে তোলা দরকার। যদি নিজের ভেতরে জুলুমের বীজ থাকে, তাকে “শক্তি” ভেবো না; যদি ন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে অপবাদ আসেই, তাতে ভেঙে যেয়ো না; আর যদি অতীতের কোনো ভুল আজও তোমাকে তাড়া করে, জেনে রাখো—ক্ষমার দরজা রবের রহমতের চেয়ে সংকীর্ণ নয়। মূসার ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি কাঁপানো সত্য রেখে যায়: মানুষকে নয়, আল্লাহকে ভয় করতে শেখো; ক্ষমতাকে নয়, হককে আশ্রয় করো; আর নিজের পরিকল্পনাকে নয়, রবের লিখনকে বিশ্বাস করো। কারণ শেষ পর্যন্ত স্থায়ী থাকে শুধু তাঁরই কুদরত, তাঁরই হিকমাহ, তাঁরই পরিকল্পনা—আর বান্দার কাজ হলো মাথা নত করে তাওবার আলোয় ফিরে আসা।