আল্লাহ তাআলা এখানে মানুষের বুকে এক অস্থির জাগরণ নেমে আসে এমন প্রশ্ন রেখেছেন: “তোমরা কি ধারণা করেছ, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি, আর তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?” এই প্রশ্নের মধ্যে কোনো কৌতুক নেই, আছে আত্মাকে নাড়া দেওয়ার মতো এক কঠিন সত্য। মানুষ কি কেবল জন্মের জন্য জন্মায়, ভোগের জন্য বাঁচে, আর তারপর মাটির ভেতরেই চিরনিশ্চুপ হয়ে যায়? না—আমাদের অস্তিত্বের ভেতরেই বান্দার দায়িত্ব, হিসাব, উদ্দেশ্য, এবং প্রত্যাবর্তনের ডাক লেখা আছে। যে হৃদয় এ আয়াত শোনে, সে বুঝতে শুরু করে: জীবন এলোমেলো নয়; শ্বাস, সময়, সুযোগ, পরীক্ষা—সবই হিসাবের অংশ।
সূরা আল-মুমিনুনের এই অংশে মুমিনের গুণাবলি, সৃষ্টির বিস্ময়, নবীদের সংগ্রাম, আর আখিরাতের নিশ্চিততা—সবকিছু একে অন্যের সঙ্গে বাঁধা। এর আগে মানুষকে তার সৃষ্টি, তার দুর্বলতা, তার ভেতরের নিদর্শন, এবং আল্লাহর কুদরতের বিভিন্ন আলামত স্মরণ করানো হয়েছে; এরপর এ আয়াত এসে যেন শেষ মোহটুকুও ভেঙে দেয়। এখানে কোনো নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনা নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং কুরআনের সার্বিক বক্তব্য হলো, মানবজাতিকে তার ভুল ধারণা থেকে ফেরানো। সমাজ যখন নিজের উদ্দেশ্য ভুলে যায়, তখন অন্যায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, জবাবদিহি বিস্মৃত হয়, আর মানুষ নিজের কামনাকেই সত্য ভেবে বসে। এই আয়াত সেই ঘোর কাটিয়ে দেয়: আমরা রবের দিকে ফিরে যাবই।
এখানে “ফিরে যাওয়া” শুধু মৃত্যুর নাম নয়; এটি পুনরুত্থান, হিসাব, এবং চূড়ান্ত বিচারের দরজা। দুনিয়ার জীবন যতই দীর্ঘ মনে হোক, তা শেষ পর্যন্ত প্রত্যাবর্তনের একটি পথমাত্র। যে মানুষ এই সত্য মনে রাখে, সে তার চোখ, জিহ্বা, উপার্জন, সম্পর্ক, এবং নীরবতারও জবাবদিহি আছে জেনে বাঁচে। আর এভাবেই অনর্থকতার অন্ধকার ভেঙে জন্ম নেয় আখিরাতমুখী জীবন—যেখানে সফলতা মানে বেশি পাওয়া নয়, বরং সঠিক পথে ফেরা; বেশি বাঁচা নয়, বরং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ফেরা। এই আয়াত তাই ভয় দেখায় না কেবল, বরং একজন পথহারা হৃদয়কে তার আসল গন্তব্য মনে করিয়ে দিয়ে বাঁচিয়ে তোলে।
মানুষের ভেতরকার সবচেয়ে গভীর ভুলটি কখনো কখনো এই যে, সে নিজেকেই উদ্দেশ্য ভেবে বসে। সে ভাবে—আমি আছি, তাই জীবন; আমি ভোগ করি, তাই সফলতা; আমি বাঁচি, তাই সবকিছু। অথচ এই আয়াত সেই ভ্রান্তির বুক চিরে জাগিয়ে দেয়: তোমাদের সৃষ্টি কি তবে অনর্থক? না, তোমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি শ্বাসেই আছে এক মহান উদ্দেশ্যের ছাপ, এক জবাবদিহির ডাক। যে পৃথিবীকে আমরা স্থায়ী ভেবে আঁকড়ে ধরি, সেটি আসলে ক্ষণস্থায়ী পরীক্ষা-ঘর; আর যে দেহকে আমরা সব মনে করি, সেটিও একদিন মাটির কাছে নত হবে। আল্লাহর এই প্রশ্নে হৃদয় কেঁপে ওঠে, কারণ এ প্রশ্নের জবাব কেবল ভাষায় নয়, জীবনের ভেতরেই দিতে হয়।
তাই এই আয়াত এক নির্মম নয়, বরং অশেষ করুণ জাগরণ। আল্লাহ আমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেননি—এই সত্যে বান্দার জীবন অর্থ পায়, মর্যাদা পায়, দায়িত্ব পায়। আর আমরা তাঁর কাছেই ফিরব—এই সত্যে হৃদয় ভয় পায়, আবার আশাও পায়; কারণ যাঁর কাছে ফিরতে হবে, তিনি তো সেই রব, যিনি আমাদের অস্তিত্ব দিয়েছেন, পথ দেখিয়েছেন, তাওবার দরজা খোলা রেখেছেন। যারা এই সত্য ভুলে যায়, তারা জীবনকে ছড়িয়ে ফেলে; আর যারা মনে রাখে, তারা জীবনকে সেজদার দিকে জড়ো করে।
কখনো কি নিঃশব্দে নিজেকে জিজ্ঞেস করেছি—আমি কেন এখানে? কেন এই দেহ, এই চিন্তা, এই ক্লান্তি, এই আনন্দ, এই ভয়? আল্লাহর এই প্রশ্ন মানুষের ভেতরের ঘুম ভেঙে দেয়: “তোমরা কি ধারণা কর যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি?” অনর্থক হলে হৃদয়ে বিবেক জাগ্রত হতো না, চোখে অশ্রু আসত না, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা থাকত না, পাপের পরে অস্থিরতা জমত না। মানুষের সত্তা নিজেই সাক্ষ্য দেয়—আমরা খেলনার মতো ছুড়ে ফেলে দেওয়ার জন্য সৃষ্টি হইনি; আমাদের ভেতরে ফিরে যাওয়ার এক অপার ডাক রাখা হয়েছে।
এই আয়াত জবাবদিহির সেই দরজায় দাঁড় করায়, যেখান দিয়ে অস্বীকারের সব অজুহাত পুড়ে যায়। সমাজ যতই বাহ্যিক সাফল্যে মাতুক, যতই ভোগকে জীবনের অর্থ বানাক, ততই এই সত্য আরও তীব্র হয়ে ওঠে: মানুষ আল্লাহর সামনে একদিন উপস্থিত হবে। তাই যে হৃদয় ঈমানকে ভালোবাসে, সে নিজের দিনের হিসাব নেয়, নিজের কথার ওজন বোঝে, দৃষ্টির পবিত্রতা রক্ষা করে, হালাল-হারামের সীমানা মানে, আর জানে যে প্রতিটি শ্বাসও ফেরার প্রস্তুতি। আখিরাতের স্মরণ মানুষকে হতাশ করে না; বরং তাকে দায়িত্বশীল, সতর্ক, এবং সত্যের প্রতি দৃঢ় করে।
আর এ কারণেই সূরা আল-মুমিনুনের এই সুরে মুমিনের সফলতা কোনো কাকতাল নয়, বরং উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবনের ফল। যে ব্যক্তি জানে তাকে আল্লাহর কাছে ফিরতেই হবে, সে দুনিয়াকে মিথ্যা আর আখিরাতকে দূরের কল্পনা মনে করতে পারে না। তার চোখে জীবন হয়ে ওঠে আমানত, সময় হয়ে ওঠে সাক্ষী, আর মৃত্যু হয়ে ওঠে শূন্যতা নয়, বরং প্রত্যাবর্তনের দরজা। এ আয়াত মুমিনের বুকে কাঁপন তোলে, আবার শান্তিও দেয়—কারণ যে কিছুই অনর্থক নয়, তার শেষও অনর্থক হতে পারে না; আর যে সৃষ্টিকে আল্লাহর দিকে ফিরতেই হবে, তার জন্যই তো সত্যিকার সফলতা অপেক্ষা করে।
ফিরে যাওয়ার কথা স্মরণ করালেই মানুষের আসল পরিচয় স্পষ্ট হয়। আমরা হারিয়ে যাওয়ার জন্য আসিনি; আমাদের সৃষ্টি সাক্ষ্যের জন্য, আনুগত্যের জন্য, তওবার জন্য, কৃতজ্ঞতার জন্য। এই পৃথিবী আমাদের চূড়ান্ত ঠিকানা নয়, এটি কেবল পরীক্ষার মাঠ—যেখানে প্রতিটি ভালোবাসা, প্রতিটি পাপ, প্রতিটি অবহেলা, প্রতিটি অশ্রু, প্রতিটি নীরবতা একদিন আলোর সামনে তুলে ধরা হবে। যে হৃদয় আজও ঘুমিয়ে আছে, সে যেন এই আয়াতে জেগে ওঠে; আর যে চোখ আজও দুনিয়ার ধুলোয় ঝাপসা, সে যেন বুঝে নেয়—মানুষের মর্যাদা তার ভোগে নয়, তার প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতিতে।
হে অন্তর, তুমি অনর্থক নও। তোমার ভেতরে যে তৃষ্ণা, তা দুনিয়ার জল মেটাবে না; তোমার ভেতরে যে ভীতি, তা কেবল আল্লাহর দরবারেই শান্ত হবে। তাই ফিরে এসো—অহংকার থেকে, গাফিলতি থেকে, পাপের অভ্যাস থেকে, নিজের জেদ থেকে। কারণ একদিন সত্যিই ফিরে যেতে হবে; আর সেই ফিরে যাওয়া যদি অশ্রুহীন হয়, তবেই তা সবচেয়ে ভয়ংকর পরাজয়। সৌভাগ্য তারই, যে আজই ফিরে আসে—নম্র হয়ে, ভেঙে পড়ে, কিন্তু রবের রহমতের দিকে মুখ তুলে।