চোখের সামনে যা ঝিলমিল করে, কুরআন আমাদের প্রথমে তারই বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করতে চায়। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা নবী মূসা আলাইহিস সালামকে এবং তাঁর মাধ্যমে সমগ্র মুমিন হৃদয়কে সতর্ক করে বলেন, দুনিয়ার সেই ভোগ-সৌন্দর্যের দিকে দৃষ্টি লম্বা কোরো না, যা কিছু লোককে সাময়িকভাবে দেওয়া হয়েছে; তা আসলে পরীক্ষা ছাড়া আর কিছু নয়। মানুষ যা দেখে, তা-ই সে চায়; আর যা চায়, তা-ই কখনও কখনও তার অন্তরের কিবলা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এই আয়াত যেন বলছে, বাহ্যিক প্রাচুর্যকে সত্যের মানদণ্ড ভেবো না। ঝলমলে বস্তু সবসময় মর্যাদার প্রমাণ নয়, আর কম থাকা কখনও অপমানও নয়। আল্লাহ যাকে দেন, তাতে পরীক্ষা আছে; আর যাকে দেন না, তাতেও রহমতের লুকানো দরজা থাকতে পারে।
সূরা ত্বহা-র এই সুর শুরু থেকেই অন্তরকে তাওহীদের দিকে ফিরিয়ে আনে, স্মরণকে জাগিয়ে তোলে, আর দুনিয়ার ভিড়ে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে গভীর করতে শেখায়। এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সান্ত্বনা ও দিকনির্দেশনা দেওয়ার ভাষা আছে—দাওয়াতের পথে যখন সত্যের আলো হাতে নিয়ে চলতে হয়, তখন অন্যদের ভোগ-বিলাস, আরাম, প্রতাপ ও প্রদর্শনী দেখে মন যেন বিচলিত না হয়। কারণ এসব কেবল সাময়িক রঙ; আজ চোখ ভরে, কালই ফুরিয়ে যায়। আয়াতের গভীরে এক নীরব শিক্ষা আছে: আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতা সম্পদের ঔজ্জ্বল্যে নয়, বরং আনুগত্য, ধৈর্য, এবং অন্তরের নম্রতায়।
আর শেষে যে বাক্যটি হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ ফেলে—‘আপনার পালনকর্তার দেওয়া রিযিক উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী’—সেটাই মুমিনের প্রকৃত আশ্রয়। এখানে রিযিক বলতে কেবল ধন-সম্পদ নয়; এর মধ্যে আছে হিদায়াত, ঈমানের প্রশান্তি, কুরআনের সঙ্গ, দোয়ার তৃষ্ণা, এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন সব দান, যা দুনিয়ার প্রদর্শনীর সঙ্গে মেলে না, কিন্তু অন্তরকে বাঁচিয়ে রাখে। এই আয়াতের ঐতিহাসিক কোনো নির্দিষ্ট একক ঘটনা নির্ভরযোগ্যভাবে চিহ্নিত না হলেও, এর প্রসঙ্গ বিস্তৃতভাবে সেই মানব-বাস্তবতাকেই স্পর্শ করে—যেখানে মানুষ দুনিয়ার চাকচিক্যে বিভ্রান্ত হয়, এবং নবী-বার্তাবাহকেরা তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে স্থায়ী সান্ত্বনা আসে রবের নিকট থেকে, বাজারের ভিড় থেকে নয়।
দাওয়াতের পথে দৃষ্টির বিপদ অনেক সময় পায়ের বিপদের চেয়েও গভীর। মানুষ যখন চোখে দুনিয়ার আলো দেখে, তখন হৃদয় ভুলে যায়—আসল আলো কোথায়। এই আয়াত সেই ভুলকে কাঁপিয়ে দেয়। আল্লাহ যেন বলছেন, যে সম্পদ সাময়িকভাবে কিছু মানুষের হাতে আছে, তা তাদের সম্মান নয়, বরং তাদের ওপর স্থাপিত এক পরীক্ষার পর্দা। তার ঝলক দেখে অন্তরকে ছোট কোরো না, নিজের রবের দানকে তুচ্ছ ভাবো না। কারণ দুনিয়ার সৌন্দর্য এমন এক আবরণ, যা কাছে এলে মুগ্ধ করে, কিন্তু আঁকড়ে ধরলে ক্লান্ত করে; আর রবের পক্ষ থেকে যা আসে, তা বাহ্যিকভাবে কম দেখালেও ভেতরে প্রশান্তি, মর্যাদা ও স্থায়িত্ব বহন করে।
এই আয়াত অন্তরকে নরম করে, কারণ এটি আমাদের শেখায়: প্রকৃত সান্ত্বনা প্রতিযোগিতায় নয়, সমর্পণে; প্রদর্শনীতে নয়, উপাসনায়; অধিকে নয়, বরকতে। যে হৃদয় নিজের রবের রিযিককে ‘খাইর ও আবকা’—উত্তম ও অধিক স্থায়ী—জানে, সে দুনিয়ার ভিড়ে নিঃসঙ্গ হয় না, বরং আল্লাহর সঙ্গে সঙ্গ পায়। আর সেই সঙ্গই মূসা আলাইহিস সালামের কাহিনির সুরের সঙ্গে মিশে যায়—আদেশ, স্মরণ, ধৈর্য, এবং মানুষের ভেতরের ভয়কে তাওহীদের আকাশে তুলে ধরা। চোখ যা দেখে তার চেয়ে বড় হলো হৃদয় যা বিশ্বাস করে; আর হৃদয় যখন রবকে যথার্থ জানে, তখন ক্ষণস্থায়ী জৌলুস আর তাকে বন্দি করতে পারে না।
দুনিয়ার চাকচিক্য মানুষকে কেবল আকর্ষণ করে না; অনেক সময় সে মানুষের অন্তরকে ধীরে ধীরে বন্দীও করে ফেলে। তাই আল্লাহ তাআলা মূসা আলাইহিস সালামকে, আর তাঁর মাধ্যমে সব ঈমানদার হৃদয়কে সতর্ক করেন—সেই সব জিনিসের দিকে চোখ টেনে লম্বা কোরো না, যেগুলো অল্প ক’জনকে সাময়িক ভোগের জন্য দেওয়া হয়েছে। এই ভোগ আসলে মর্যাদার সনদ নয়, আর এই ভোগশালার আলো সত্যের আলোকও নয়। সমাজ যখন বাহ্যিক সম্পদ, সাজসজ্জা, আর আরামকে সাফল্যের মানদণ্ড বানায়, তখন বিশ্বাসী মানুষকে আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেন: যা ঝিলমিল করে, তা-ই স্থায়ী নয়; আর যা কম, তা-ই অপমান নয়। চোখের লোভের শেষ প্রান্তে প্রায়ই অন্তরের ক্ষত থাকে। তাই এই আয়াত আমাদের নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায়—আমি কি দুনিয়াকে দেখছি, নাকি দুনিয়ার আড়ালে রবের ইচ্ছাকে দেখছি?
আল্লাহ বলেন, এ সবকিছু দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করা হয়। অর্থাৎ যার কাছে আছে, সে কি কৃতজ্ঞ হবে; যার কাছে নেই, সে কি ধৈর্য ধরবে; আর যার হৃদয়ে আছে, সে কি আল্লাহকে ভুলে যাবে, নাকি আরও বেশি তাঁর দিকে ফিরবে। এখানে ভয়ও আছে, আবার সান্ত্বনাও আছে। ভয় এই যে, দুনিয়ার মোহ ঈমানের স্বাদ কমিয়ে দিতে পারে; সান্ত্বনা এই যে, রবের রিযিকই উত্তম ও অধিক স্থায়ী—সেই রিযিক, যা শুধু পেটে নয়, অন্তরে প্রশান্তি দেয়; শুধু আজকে নয়, আখিরাতেও আলো হয়ে থাকে। মানুষের উপার্জন ক্ষয়ে যায়, চেহারার দীপ্তি ম্লান হয়, সৌভাগ্যের বাহ্যিক আসন ভেঙে পড়ে; কিন্তু আল্লাহর দেওয়া রিযিকের মধ্যে যদি হিদায়াত, তৃপ্তি, পবিত্রতা, আর তাঁর প্রতি নির্ভরতা থাকে, তবে তা মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই আয়াত শেষে আমাদের মুখ ফিরিয়ে দেয় স্থায়ীর দিকে—যেখানে দৃষ্টি থেমে গেলে ফিতনা কমে, আর অন্তর আল্লাহর দিকে ফিরে গেলে জীবন প্রশান্ত হয়।
দৃষ্টি যখন দুনিয়ার ঝিলমিলে আটকে যায়, তখন হৃদয় আস্তে আস্তে তার নিজের রবকে ভুলে বসে। এই আয়াত সেই ভুলে যাওয়া হৃদয়কে কোমল কিন্তু কঠিন সত্য শোনায়—যা কিছু চোখকে আকর্ষণ করে, তা সবই তোমার জন্য নয়; আর যা তোমার জন্য রাখা হয়েছে, তা অনেক সময় চোখে ধরা পড়ে না। আল্লাহর রিযিক শুধু খাবার-পোশাক নয়; কখনও তা ধৈর্য, কখনও সন্তুষ্টি, কখনও অশ্রুর ভিতরে লুকানো প্রশান্তি, কখনও দুনিয়ার থেকে মুখ ফিরিয়ে আনে এমন এক ঈমান। দুনিয়ার সৌন্দর্য মানুষকে পরীক্ষা করে, কিন্তু রবের দান মানুষকে গড়ে। ঝলমলে বস্তু হাতে থাকলেই মন শান্ত হয় না; বরং কত চমকই না অন্তরকে আরও শূন্য করে দেয়।
তাই এই আয়াত যেন বলে, তোমার চোখ নিচু করো, কিন্তু তোমার আশা উঁচু রাখো। মানুষের হাতে যা আছে, তা দেখে নিজের ভাগ্য মাপো না; কারণ মানুষের দেওয়া ক্ষণস্থায়ী, আর আল্লাহর দেওয়া অধিক স্থায়ী। আজ যে জিনিসকে আমরা সাফল্য ভাবি, কাল তা শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে। কিন্তু যে অন্তর আল্লাহর প্রতি সমর্পিত, সে কম পেয়ে হারায় না; সে বেশি পেলেও বিভ্রান্ত হয় না। হে অন্তর, দুনিয়ার প্রদর্শনীকে কিবলা বানিও না। ফিরে এসো সেই রবের দিকে, যাঁর রিযিকের মধ্যে বরকত আছে, যাঁর দানে পরিতৃপ্তি আছে, আর যাঁর কাছে যা আছে তা কখনও ফুরায় না।