এই আয়াতে মূসা আলাইহিস সালাম এক অপূর্ব সংক্ষিপ্ততায় তাওহীদের মর্মকথা উচ্চারণ করেন: “তিনি তোমাদের পালনকর্তা এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরও পালনকর্তা।” এখানে যুক্তি নেই কৃত্রিম ভাষার, নেই অহংকারের প্রদর্শন; আছে সত্যের নিখাদ সরলতা। ফেরাউনের দরবারে, যেখানে ক্ষমতার গর্জন মানুষকে কাঁপিয়ে দিতে চায়, সেখানে মূসা এমন এক বাক্য বলেন যা রাজসিংহাসনকেও ক্ষুদ্র করে দেয়। মানুষ নিজেকে যত বড় ভাবুক, তার রবের সামনে সে-ও সৃষ্টি; আর তার পূর্বপুরুষরাও সেই একই স্রষ্টা, পালনকারী ও ব্যবস্থাপক আল্লাহর দাস।
এ কথা শুধু একটি তর্কের জবাব নয়; এটি ইতিহাসের বুকে রাখা এক চিরন্তন স্মরণচিহ্ন। যিনি আজ আমাকে লালন করছেন, তিনিই আমার আগের সকল বংশধরকে লালন করেছেন। যাঁর হাতে আমার জীবন, তাঁর হাতেই ছিল আমার পিতৃপুরুষদের জীবন; যাঁর কুদরতে আজকের নিশ্বাস, তাঁরই কুদরতে ছিল অতীতের সমস্ত যুগের নিশ্বাস। এই আয়াতে আল্লাহর রুবুবিয়্যতকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যে, যুগের পর যুগ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম, সব কিছুর ওপর তাঁর মালিকানা ও প্রতিপালন সমানভাবে বিস্তৃত। মানুষ বদলায়, রাজ্য বদলায়, স্মৃতি মুছে যায়; কিন্তু আল্লাহর কর্তৃত্বের পরিধি কখনো সংকুচিত হয় না।
সূরা আশ-শুআরার এই অংশে নবীদের কাহিনি শুধু ইতিহাস বলে না; সে মানুষকে দাওয়াতের আসল ভাষা শিখিয়ে দেয়। কখনো সত্যকে রঙিন কবিতায় নয়, বরং সরল উচ্চারণে বলতে হয়; কখনো মিথ্যার বিশাল প্রাসাদকে ভাঙতে একটি বাক্যই যথেষ্ট হয়ে ওঠে, যদি সে বাক্য আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। মূসা আলাইহিস সালামের এই উত্তর সেই আত্মম্ভরী সমাজব্যবস্থার বুক চিরে দেয় যেখানে মানুষ নিজের ক্ষমতাকে শেষ সত্য মনে করে। বাস্তবতা হলো, প্রত্যেক শাসক, প্রত্যেক পিতা, প্রত্যেক প্রজন্ম—সবাই এক রবের সামনে সমানভাবে অভাবী। এই আয়াত তাই শুধু ফিরআউনের জন্য নয়; আজকের হৃদয়ের জন্যও। যে হৃদয় নিজেকে স্বাধীন ভাবতে গিয়ে রবকে ভুলে যায়, এ বাক্য তাকে আবার জাগিয়ে তোলে: তোমার রবও তিনি, তোমার পূর্ববর্তীদের রবও তিনি।
ফেরাউনের দরবারে মূসা আলাইহিস সালামের এই কথা যেন বজ্রপাতের মতো নেমে আসে, কিন্তু তার ভেতরে কোনো উত্তেজনার শব্দ নেই—আছে নির্মল সত্যের শান্ত দীপ্তি। তিনি ক্ষমতার ভাষায় কথা বলেন না; তিনি সত্যের ভাষায় কথা বলেন। “তিনি তোমাদের রব, এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদেরও রব”—এই এক বাক্যে মানুষে-মানুষে গড়া সব অহংকার ভেঙে পড়ে। যে নিজেকে ইতিহাসের কেন্দ্র মনে করে, যে নিজের বংশ, সভ্যতা, সিংহাসন, জাতি বা সম্পদ দিয়ে মাপতে চায়, তার সামনে এই ঘোষণা নিঃশব্দে জানিয়ে দেয়: তোমাদের আগেও রব ছিলেন, তোমাদের পরেও রব থাকবেন, আর তোমরা সবাই তাঁরই সৃষ্টি, তাঁরই রিযিকপ্রাপ্ত, তাঁরই নিয়ন্ত্রণাধীন।
এই আয়াত আমাদের অন্তরে এক অদ্ভুত কম্পন জাগায়: আমরা যে কেবল বর্তমানের অধিবাসী নই, আমরা অতীতেরও সন্তান, আর ভবিষ্যতেরও যাত্রী—এবং সব কিছুর উপরে একমাত্র আল্লাহর মালিকানা। তাই সত্যের দাওয়াত সবসময়ই এত সরল, এত ভারী, এত অপ্রতিরোধ্য: রব একজনই। এই ঘোষণার সামনে ফেরাউনের রাজ্যও তুচ্ছ, মানুষের অহংকারও তুচ্ছ, আর আমাদের নিজেদের আত্মপ্রবঞ্চনাও তুচ্ছ হয়ে যায়। যে হৃদয় এই সত্য গ্রহণ করে, সে জানে—নিজের উৎসকে চিনতে পারাই ইমানের শুরু; আর রবকে চিনে ফেলা মানেই ভয়ের ভেতর মুক্তি, বিভ্রান্তির ভেতর দিশা, এবং সৃষ্টির ভিড়ে একমাত্র স্রষ্টার দিকে ফিরে যাওয়ার সাহস।
ফেরাউনের দরবারে মূসা আলাইহিস সালামের এই একটিমাত্র বাক্য যেন সময়ের বুকে আঘাত করে। তিনি বলেন, তিনি তোমাদের পালনকর্তা, আর তোমাদের পূর্ববর্তীদেরও পালনকর্তা। অর্থাৎ সত্য কেবল এই মুহূর্তের নয়; সত্য কেবল আজকের শক্তিমানদের জন্যও নয়। যাদের ওপর গুমরাহি আর অহংকারের প্রলেপ জমেছে, তাদেরও আগে যাঁর সত্তা ছিল, আজও আছেন, কালও থাকবেন, তিনিই আল্লাহ। মানুষ বংশের গৌরব নিয়ে বাঁচতে চায়, শাসন নিয়ে বাঁচতে চায়, নিজের নাম নিয়ে বাঁচতে চায়; কিন্তু এই আয়াত মনে করিয়ে দেয়, তোমার বংশও তোমার মতোই কারও সামনে নত ছিল, তোমার পূর্বপুরুষরাও কারও তৈরি, কারও লালিত, কারও ব্যবস্থাপনায় জীবিত ছিল। তাই যে হৃদয় নিজেকে কেন্দ্র বানিয়ে ফেলে, এই আয়াত তার বুকের ভেতর এক নীরব ধ্বংস নামিয়ে আনে।
এখানে দাওয়াতের ভাষা কত সহজ, অথচ কত ভারী। মূসা আলাইহিস সালাম মিথ্যার সাথে মিথ্যার ভাষায় লড়েননি; তিনি সত্যকে তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতায় উচ্চারণ করেছেন। এই সত্য মানুষকে শুধু তর্কে হারায় না, আত্মাকে জাগায়। যখন এক বান্দা বুঝে যায় যে তার রব কেবল তার একার নয়, বরং তার বাপ-দাদারও, তখন সে ইতিহাসের মাঝখানে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র, খুব দরিদ্র, খুব নির্ভরশীল বলে অনুভব করে। এ অনুভূতিই তাওহীদের দরজা খুলে দেয়। আর যে দরজা খুলে যায়, তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে লজ্জা, তওবা, ভয়, আশা—সবকিছু। ফেরাউনের মতো শক্তিমানও যে রবের সামনে দাঁড়ায়, সেই রবের কাছে আমাদের গোপন অহংকার, গোপন পাপ, গোপন অবাধ্যতা কত তুচ্ছ!
এই এক বাক্যে ফেরাউনের সব গর্ব ভেঙে পড়ে, কারণ মূসা আলাইহিস সালাম মানুষকে মানুষের সামনে নয়, আল্লাহর সামনে দাঁড় করান। যে সত্তা তোমার রব, তিনিই তোমার পিতৃপুরুষদেরও রব—অতএব সময়ের সঙ্গে সত্য বদলায় না, ক্ষমতার সঙ্গে সত্য নত হয় না, আর প্রজন্মের পরিবর্তনে আল্লাহর কর্তৃত্বে এক বিন্দু কমে না। মানুষের ইতিহাস যত দীর্ঘ হোক, তার শুরুও আল্লাহর হাতে, তার ধারাবাহিকতাও আল্লাহর হাতে; তাই যারা নিজেদের বড় মনে করে, তাদের বুকের ভেতরেও একদিন এই একই প্রশ্ন জেগে উঠবে: আমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছি?
এই আয়াত আমাদের অহংকারের ভিতরে নীরবে কাঁপন ধরায়। আমরা কত সহজে নিজের বংশ, স্মৃতি, পরিচয়, অর্জন, উত্তরাধিকার নিয়ে বুক ফুলিয়ে উঠি; অথচ মূসার এই ঘোষণায় সব উত্তরাধিকার ফিরে যায় একমাত্র রবের দিকে। তোমার আগে যারা চলে গেছে, তারা কি নিজের শক্তিতে টিকে ছিল? তোমার পরে যারা আসবে, তারাও কি নিজের চেষ্টায় টিকে থাকবে? না—সবাই একই দরবারের সৃষ্টি, একই অনুগ্রহের ভিখারি, একই প্রতিপালনের অধীন। তাই তাওহীদ কেবল একটি বিশ্বাসের নাম নয়; এটি আত্মাকে ভেঙে দিয়ে আল্লাহর সামনে সিজদায় নামার নাম।
যে হৃদয় এই সত্য গ্রহণ করে, সে আর নিজের ভেতরে বন্দি থাকে না। সে জানে—তার অতীতও আল্লাহর, তার বর্তমানও আল্লাহর, তার ভবিষ্যৎও আল্লাহর; তাই গুনাহের অন্ধকারে আর দেরি করা যায় না, তওবার দরজা খোলা থাকতেই ফিরতে হয়। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তর থেকে সেই সব পর্দা সরিয়ে দিন যা আমাদেরকে রবের স্মরণ থেকে গাফেল রাখে। আমাদের এমন এক বিশ্বাস দিন, যা শুধু মুখে নয়—নম্রতায়, ভয়ভক্তিতে, আনুগত্যে, এবং আপনার কাছে প্রত্যাবর্তনে জীবিত থাকে।