ফেরাউনের প্রাসাদে, যেখানে জুলুমের দেয়ালগুলোও যেন অহংকারে কাঁপত, সেখানেই এক অচেনা শিশুকে নিয়ে উঠল এমন এক বাক্য, যা ইতিহাসের গতি বদলে দিল। ফেরাউনের স্ত্রী বললেন, “এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি, তাকে হত্যা কোরো না।” কুরআনের এই সংক্ষিপ্ত আয়াতে কত বিস্তীর্ণ অর্থ! যে ঘরে ছিল ক্ষমতার দম্ভ, সেখানে এক নারীর মুখে ফুটে উঠল মমতার ভাষা; আর সেই মমতার আড়ালেই আল্লাহ নিজের পরিকল্পনাকে অচল মনে হওয়া প্রাচীরের ভেতর দিয়ে এগিয়ে নিলেন। মূসা আলাইহিস সালামের জীবন এখানে কেবল একটি শিশুর রক্ষা পাওয়ার ঘটনা নয়; এটি তাকদিরের সেই বিস্ময়কর দৃশ্য, যেখানে মানুষের ভয়, কৌশল ও সিদ্ধান্তের ওপরে আল্লাহর ইচ্ছা নিঃশব্দে বিজয়ী হয়।
তবে এই আয়াতকে পড়তে গিয়ে কেবল আবেগে ভেসে গেলে যথেষ্ট হয় না। এটি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতাকেও স্পর্শ করে: ফিরআউনের ঘর ছিল বানী ইসরাঈলের ওপর নিপীড়নের প্রতীক, আর সেই নিপীড়নের মধ্যেই আল্লাহ এমনভাবে হেফাজত শুরু করলেন, যেন শত্রুর অজান্তেই তার ঘরের ভিতরে মোক্ষের একটি দরজা খুলে গেল। ‘এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি’—এই কথার মধ্যে মানুষের হিসাব আছে, কিন্তু পরিণামের পূর্ণ জ্ঞান নেই। এ যেন মানব-পরিকল্পনার সীমা ও রব্বানী ব্যবস্থাপনার অসীমতার সাক্ষ্য। যে সন্তানকে তারা হারিয়ে দিতে চেয়েছিল, তার মধ্যেই তাদের ভবিষ্যৎ ভেঙে পড়ার বীজ লুকিয়ে ছিল; আর যে কথাকে তারা স্নেহের ভাষা ভেবেছিল, তা আসলে আল্লাহর কুদরতের হাতে লেখা এক ঘোষণা।
ফেরাউনের স্ত্রীর এই কথা—“এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি, তাকে হত্যা কোরো না”—শুধু মায়ের হৃদয়ের ভাষা নয়; এটি এমন এক মুহূর্ত, যেখানে জুলুমের প্রাসাদে হঠাৎ করুণার দরজা খুলে যায়। মানুষ ভেবেছিল, একটি শিশুর জীবন তার চারপাশের শক্ত হাতে নির্ধারিত হবে; কিন্তু আল্লাহ দেখালেন, হৃদয়ের একটিমাত্র নরম স্পন্দনও তাঁর পরিকল্পনার বাহন হয়ে উঠতে পারে। ফিরআউন জানত না, সে যে ঘরে দম্ভের মূর্তি গড়ে তুলেছে, সেই ঘরেই একদিন তারই বিরুদ্ধে সত্যের এক নীরব সাক্ষী লালিত হবে। যে শিশুকে হত্যা করতে চেয়েছিল ক্ষমতা, তাকেই আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলেন ক্ষমতার বুকের ভেতরেই—এমনভাবে, যেন মানব-পরিকল্পনার ওপর তাকদিরের সিলমোহর নেমে আসে।
এই আয়াতে “আমাদের উপকারে আসতে পারে” বাক্যটি কেবল পারিবারিক সম্ভাবনা নয়; এর মধ্যে লুকিয়ে আছে মানুষের অদেখা ভবিষ্যৎ-অজ্ঞতার গভীর শিক্ষা। আমরা কত কিছুই না হিসাব করি, কত দরজার তালা কষে ধরি, কত রক্ষাকবচ বানাই—তবু পরিণাম আমাদের হাতে থাকে না। ফেরাউন ও তার সঙ্গীরা বুঝতেই পারেনি, যাকে তারা আশ্রয় দিচ্ছে, তিনিই তাদের মিথ্যার বিরুদ্ধে ইতিহাসের এক আলোকবর্তিকা হয়ে উঠবেন। আল্লাহর কুদরত এমনই; তিনি কখনো শত্রুর ঘরেই বান্দার নিরাপত্তা লিখে দেন, আবার কখনো নিরাপত্তার মধ্যেই শত্রুর পরাজয়ের বীজ বপন করে দেন। মানুষের চোখে এটি কেবল এক শিশুকে বাঁচানো, আর ঈমানের চোখে এটি তকদিরের বিশাল দরজা খুলে যাওয়া।
ফেরাউনের ঘরে দাঁড়িয়ে যে শিশুকে “নয়নমণি” বলা হলো, সে তো কেবল একটি শিশু নয়; সে ছিল আল্লাহর অদৃশ্য পরিকল্পনার জীবন্ত অক্ষর। মানব-মন যখন কেবল বর্তমান দেখে, তখন তাকদির ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেয়। যে ঘর নিষ্পেষণের প্রতীক, যে প্রাসাদ বানী ইসরাঈলের কান্নায় ভেজা ইতিহাসকে উপহাস করছিল, সেই ঘরের ভেতরেই আল্লাহ এক কোমল বাক্যের মাধ্যমে নিজের রহমতকে প্রবেশ করালেন। এটি আমাদের শেখায়, কোনো শক্তি নিজেকে যতই অপ্রতিরোধ্য ভাবুক, আল্লাহর ইচ্ছার সামনে সে কেবলই দুর্বল, অন্ধ, এবং সীমাবদ্ধ। মানুষ পরিকল্পনা করে; আল্লাহ সেই পরিকল্পনার ভেতরেও এমন পথ রাখেন, যা মানুষ কল্পনাও করতে পারে না।
আরও এক গভীর শিক্ষা হলো—ফেরাউনের স্ত্রীর কথায় মমতা ছিল, কিন্তু সেই মমতার ফল কী হবে, তা তিনি জানতেন না। “এ আমাদের উপকারে আসতে পারে”—এই ছোট্ট সম্ভাবনার বাক্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক মহান সত্য: আল্লাহ কখনো কখনো এমন হাত থেকে রক্ষা দেন, যাদের হৃদয়ে ঈমানের পূর্ণ আলো এখনও জ্বলে ওঠেনি। এতে বান্দার জন্য ভয়ও আছে, আশাও আছে। ভয় এ কারণে যে, আমাদের হাতে থাকা সুযোগগুলোও আল্লাহর ইচ্ছায় খুলে বা বন্ধ হয়ে যায়; আর আশা এ কারণে যে, সবচেয়ে অন্ধকার পরিবেশেও আল্লাহ নিজের জন্য একটি পথ বানিয়ে রাখেন। তাই মুমিনের কাজ হলো নিজের অন্তরকে জিজ্ঞেস করা: আমি কি আমার জীবনের ঘটনাগুলোকে শুধু মানুষের কৌশল বলে পড়ছি, নাকি এর ভেতরে রব্বুল আলামিনের নিখুঁত ব্যবস্থাকে দেখতে শিখছি?
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে আত্মা নরম হয়ে আসে। কারণ আমরা বুঝতে পারি, জীবনের অনেক দরজা ভাঙা মনে হলেও আল্লাহর কাছে সেগুলো খুলে দেওয়ার জন্য একটিমাত্র বাক্যই যথেষ্ট। বান্দা যখন নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে কাঁপে, তখন এই আয়াত তাকে বলে—তুমি কেবল দৃশ্যমান অংশ দেখো; আল্লাহ অন্তরালের মালিক। যখন সমাজ জুলুমে ভারী হয়ে ওঠে, তখনও আল্লাহ তাঁর নীরব কুদরত দিয়ে ইতিহাসের দিশা বদলে দেন। তাই অন্তরের ফিরে আসা এখনই প্রয়োজন: অহংকার থেকে তাওবার দিকে, ভয় থেকে তাওয়াক্কুলের দিকে, অন্ধ আত্মবিশ্বাস থেকে আল্লাহর পরিকল্পনার সামনে নত হওয়ার দিকে। ফেরাউনের প্রাসাদে বেঁচে যাওয়া সেই শিশু আমাদের বলে, আল্লাহর হাতে গেলে দুর্বলতম ক্ষণও নাজাতের সূচনা হতে পারে।
যে ফেরাউন শিশুদের হত্যা করছিল, তারই প্রাসাদে সেই শিশুর জন্য নিরাপত্তার দরজা খুলে গেল। এ দৃশ্য আমাদের শেখায়, আল্লাহর কুদরত মানুষের পরিকল্পনার বন্দি নয়; তিনি শত্রুর কৌশলকেও নিজের রহমতের বাহন বানিয়ে দেন। স্ত্রীটি বললেন, ‘নয়নের মণি’—আর এই একটি কোমল বাক্যের ভেতর দিয়ে জুলুমের অন্ধকারে ঢুকে গেল আল্লাহর অদৃশ্য সিদ্ধান্ত। মানুষ ভাবল, তারা গ্রহণ করছে; আসলে আল্লাহ গ্রহণ করাচ্ছেন। মানুষ ভাবল, তারা বাঁচাচ্ছে; আসলে আল্লাহ তাঁর নবীকে এমন এক পথে গড়ে তুলছেন, যেখানে ভয়ও একদিন হেদায়েতের সাক্ষী হবে।
আমাদের জীবনের ভেতরেও কতবার এমন হয়—যা প্রথমে বিপদ মনে হয়, সেটিই পরে আল্লাহর দয়ার দরজা হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা তাড়াহুড়া করে ভয় পাই, অভিযোগ করি, নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। এই আয়াত হৃদয়কে নরম করে দেয়: সবকিছু দেখা যাচ্ছে না বলেই তা বিশৃঙ্খলা নয়, সবকিছু বুঝে উঠতে পারছি না বলেই তা অর্থহীন নয়। আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে তাঁর পথে নিতে চান, তখন তিনি প্রাসাদও ব্যবহার করেন, নীলনদও ব্যবহার করেন, শত্রুর হৃদয়ও ব্যবহার করেন, আর এক শিশুর নীরব নিঃশ্বাসকেও ইতিহাস বদলের মাধ্যম বানিয়ে দেন।
তাই আজ নিজের অন্তরকে একটু থামিয়ে বলি, আমি জানি না, কিন্তু আমার রব জানেন; আমি ভেঙে পড়ি, কিন্তু তাঁর পরিকল্পনা ভাঙে না। গুনাহের ভারে যে হৃদয় ক্লান্ত, দুশ্চিন্তার বুকে যে বুক কাঁপে, তাকদিরের সামনে যে আত্মা ছোট হয়ে যায়—সে যেন মূসার এ ঘটনাকে স্মরণ করে। আল্লাহর ব্যবস্থা দেরি করে না, শুধু আমাদের চোখের হিসাবের বাইরে কাজ করে। যে রব ফেরাউনের ঘরে মূসাকে রক্ষা করেছেন, তিনিই আজও তাঁর মুমিন বান্দাকে এমন পথ দিয়ে টেনে নেন, যেখানে শেষ পর্যন্ত কেবল তাঁরই প্রশংসা বাকি থাকে।