মুসা আলাইহিস সালামের দীর্ঘ কাহিনি, ফিরআউনের অহংকার, দুর্বলদের আহাজারি, সত্যের পথের কাঁটাযুক্ত যাত্রা, আর কারূনের ধনমত্ততার ধ্বংস—এই সব কিছুর পরে সূরা আল-কাসাসের এই আয়াত যেন অন্তরের উপর নেমে আসে শান্ত অথচ অপ্রতিরোধ্য এক সত্য হয়ে। وَهُوَ ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ—তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। অর্থাৎ ইতিহাস যতই বিচিত্র হোক, ক্ষমতার রং যতই বদলাক, মানুষের দম্ভ যতই আকাশ ছুঁতে চাইুক, শেষ সত্য একটাই: সৃষ্টির সবার ওপরে একমাত্র মালিক আছেন। তাঁর সামনে ফিরআউনের সিংহাসনও নত, কারূনের সম্পদও তুচ্ছ, আর মুসার মিশনও তাঁরই নির্দেশে পূর্ণতা পায়।

এই আয়াতে আরও বলা হয়েছে, ইহকাল ও পরকালে প্রশংসা একমাত্র তাঁরই। দুনিয়ায় মানুষ অনেক কিছুর প্রশংসা করে—সাফল্যকে, সৌন্দর্যকে, শক্তিকে, অর্জনকে; কিন্তু আয়াত মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত হামদ, চূড়ান্ত কৃতজ্ঞতা, সর্বোচ্চ মহিমা কেবল আল্লাহর জন্য। কারণ যা কিছু আছে, তা এসেছে তাঁর দান থেকে; আর যা কিছু হারিয়ে যায়, তা-ও তাঁর হিকমতের বাইরে নয়। এই সুরার পুরো বয়ান মুমিনকে শেখায় যে দৃশ্যমান শক্তি আসলে স্থায়ী নয়, আর অলৌকিক শাসকও নয়; স্থায়ী হলেন সেই রব, যিনি গোপনে পরিকল্পনা করেন, ধীরে ধীরে ঘটনাকে এগিয়ে নেন, এবং অবশেষে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেন।

আয়াতের শেষে ঘোষণা আসে—وَلَهُ ٱلْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ। বিধান তাঁরই, এবং তোমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাবে। মক্কার পরিবেশে এই কথার আধ্যাত্মিক অভিঘাত ছিল গভীর: যারা মুসলিমদের দুর্বল দেখে উপহাস করত, যারা মনে করত ক্ষমতার ফয়সালা তাদের হাতে, যারা জুলুমকে স্থায়ী মনে করত—তাদের সকলকে এই বাক্য নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে জবাব দেয়। তাফসিরের নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ-নুযূল এখানে প্রতিষ্ঠিত না হলেও, পুরো সুরার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে যে এটি আল্লাহর পরিকল্পনার সামনে মানুষের সীমাবদ্ধতা, দুনিয়ার প্রতারণা, এবং শেষ বিচারের অনিবার্যতার কথা হৃদয়ে বসাতে এসেছে। এই আয়াত তাই শুধু খবর নয়; এটি আত্মাকে জাগিয়ে তোলা এক ঘোষণা—ফেরা যখন অনিবার্য, তখন হুকুমের মালিককে ভুলে বাঁচা কত বড় আত্মভোলা অবস্থা।

আর তারপর আসে বাক্যটির ভেতরের বজ্রধ্বনি: “আর বিধান তাঁরই ক্ষমতাধীন।” এই একটি ঘোষণাই মানুষের সব ভেজা অহংকার শুকিয়ে দেয়। ফিরআউন নিজেকে বিধানদাতা ভেবেছিল, কারূন ভেবেছিল ধনই ভাগ্য নির্ধারণ করে, আর শক্তিমানরা ভেবেছিল ক্ষমতাই শেষ কথা; কিন্তু কাসাসের প্রতিটি বাঁক এসে জানিয়ে দেয়, হুকুমের মালিক আসলে আসমান-জমিনের রব। মানুষের পরিকল্পনা থাকে, চক্রান্ত থাকে, প্রতিশোধের ইচ্ছা থাকে, পলায়নের পথ থাকে—কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা যখন নেমে আসে, তখন লুকিয়ে থাকা সত্য প্রকাশ পায়, অন্যায় তারই ভারে ডুবে যায়, আর নিপীড়িতের দীর্ঘশ্বাসও একদিন ন্যায় হয়ে ফিরে আসে। এই আয়াত তাই শুধু ঈমানের ঘোষণা নয়; এটি ইতিহাসের বুক চিরে দেওয়া এক চূড়ান্ত বাস্তবতা।

আর “তোমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে”—এই অংশটি হৃদয়ের ভেতরে সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে ভয়াবহ দরজাটি খুলে দেয়। আমরা দুনিয়ায় কত দূর ছড়িয়ে পড়ি, কত সম্পর্ক জুড়ে দিই, কত সম্পদের চারপাশে নিজের নাম লিখে ফেলতে চাই; কিন্তু শেষে পথ একটাই, ফিরে যাওয়া। ফিরআউনের সাম্রাজ্যও ফিরে গেছে, কারূনের সম্পদও, মুসার কষ্টও, মজলুমের কান্নাও—সবই একদিন আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হবে। সেখানে রূপের মোহ থাকবে না, ক্ষমতার মদ থাকবে না, অজুহাতের আশ্রয় থাকবে না; থাকবে কেবল সেই রবের সামনে দাঁড়ানো, যিনি শুরুতেও ছিলেন, শেষেও থাকবেন, এবং যাঁর জ্ঞানের বাইরে কিছুই যায় না। এই প্রত্যাবর্তনের স্মৃতি মুমিনকে ভেঙে দেয়, আবার গড়েও তোলে—কারণ যে জানে সে ফিরে যাবে, সে আর দুনিয়াকে চূড়ান্ত ভেবে বসে না।
তাই এই আয়াত মুসা আলাইহিস সালামের কাহিনির শেষে এসে আমাদেরও জিজ্ঞেস করে: তুমি কাকে সত্য মনে করছ, কাকে ভয় করছ, কাকে আশা করছ? আল্লাহই যখন একমাত্র ইলাহ, হামদের একমাত্র হকদার, হুকুমের একমাত্র অধিপতি, আর প্রত্যাবর্তনের একমাত্র ঠিকানা—তবে মানুষের হৃদয় আর কোথায় নিজের নিরাপত্তা খুঁজবে? মুমিনের জন্য এই আয়াত একসাথে সান্ত্বনা ও সতর্কবার্তা; যারা ক্লান্ত, তাদের জন্য এটি আশ্রয়; যারা গর্বিত, তাদের জন্য এটি ধ্বংসকারী আয়না। শেষ পর্যন্ত সব কাহিনি, সব যুদ্ধ, সব অর্জন, সব ক্ষতি—সবকিছুই এসে থামে আল্লাহর কাছে। আর যে অন্তর এই সত্যকে আজ চিনে নেয়, সে দুনিয়ার মধ্যেই আখিরাতের আলো পেয়ে যায়।

এই আয়াত যেন মুসা আলাইহিস সালামের দীর্ঘ পথের শেষে, ফিরআউনের গর্জন আর কারূনের অহংকারের পর, মানুষের অন্তরে নেমে আসা এক চিরন্তন ঘোষণা। দুনিয়া কতই না দ্রুত বদলায়—রাজপ্রাসাদ ডুবে যায়, সম্পদ মাটির নিচে হারিয়ে যায়, ক্ষমতার মুকুট ঝরে পড়ে; কিন্তু আল্লাহর একত্ব এক মুহূর্তও বদলায় না। তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তাই জীবনের প্রতিটি মোড়ে যখন মানুষ অন্য কিছুকে ভরসা বানায়, এই আয়াত নীরবে বলে দেয়: তুমি যাকে বড় ভাবছ, সে বড় নয়; যিনি সত্যিই বড়, তিনিই আল্লাহ। তাঁরই জন্য প্রশংসা ইহকালে, তাঁরই জন্য প্রশংসা পরকালে—কারণ তাঁর দান ছাড়া কোনো নেয়ামত নেই, তাঁর হিকমত ছাড়া কোনো হ্রাস-বৃদ্ধিও নেই।

এই কথার ভেতরে সমাজের জন্যও এক কঠিন শিক্ষা আছে। মানুষ যখন হুকুমকে নিজের হাতে নিতে চায়, তখনই জুলুম জন্ম নেয়; যখন অর্থ, বংশ, শক্তি, কিংবা পদমর্যাদাকে চূড়ান্ত সত্য বানায়, তখনই ফিরআউনীয় মানসিকতা জেগে ওঠে। কিন্তু আল্লাহ বলেন, বিধান তাঁরই ক্ষমতাধীন। অর্থাৎ ন্যায় ও অন্যায়, হালাল ও হারাম, ক্ষমতা ও দুর্বলতা—সবকিছু তাঁর নির্ধারণে বাঁধা। মানুষ আইন বানাতে পারে, কিন্তু ন্যায়কে সৃষ্টি করতে পারে না। মানুষ শাসন করতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের অন্তিম ফয়সালা দিতে পারে না। তাই যে সমাজ আল্লাহর হুকুমকে ভুলে যায়, সে বাহ্যিকভাবে শক্তিশালী হলেও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে; আর যে অন্তর এই আয়াতকে মানে, সে অল্পের মধ্যে শান্তি পায়, অনিশ্চয়তার মাঝেও দিশা পায়।

আর শেষে আসে সেই বাক্য, যা প্রতিটি আত্মাকে কাঁপিয়ে দেয়: এবং তোমরা তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে। এটাই তাকদিরের পরিণতি, এটাই জীবনের শেষ সত্য, এটাই সমস্ত দম্ভের সমাপ্তি। আমরা ফেরার পথে আছি—প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি অর্জন, প্রতিটি হারানো জিনিস আমাদের সেই সাক্ষাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই মুমিনের হৃদয় একসঙ্গে ভয়ে ও আশায় জেগে ওঠে: ভয়ে, কারণ ফয়সালা আল্লাহর; আশায়, কারণ ফেরার স্থানও আল্লাহর কাছেই। এই আয়াত শেখায়, জীবনকে যেন আমরা মালিকের কাছে ফেরা এক সফর হিসেবে দেখি, অহংকারে নয়, গাফলতে নয়, বরং হিসাবের প্রস্তুতিতে। শেষ কথা এই: যিনি শুরু করেছেন, তিনিই শেষ করবেন; যিনি দান করেছেন, তিনিই জিজ্ঞেস করবেন; আর যাঁর দিকে ফিরে যেতে হবে, তাঁর সমুখে শুধু সঠিক ঈমান, বিনীত হৃদয়, ও আত্মসমর্পিত জীবনই মানুষকে বাঁচাতে পারে।

এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ আর নিজের হাতে গড়া পরিচয়ের ওপর ভর করতে পারে না। এখানে ফিরআউনের প্রতাপও ম্লান, কারূনের ধনও নিষ্প্রভ, মুসার সংগ্রামও শেষ পর্যন্ত আল্লাহর হুকুমেই অর্থ পায়। ইহকালে আমরা যাকে বড় বলি, যাকে ভয় করি, যাকে সফল মনে করি—সবই একদিন তাঁরই আদালতে ফিরে যাবে। তাই হৃদয়কে আজই শেখাতে হয়: প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য একমাত্র তিনিই, সিদ্ধান্তের অধিকারও একমাত্র তাঁরই, এবং আমাদের শেষ ঠিকানাও তাঁরই কাছে। মানুষ যতই দুনিয়ার শব্দে মগ্ন থাকুক, অন্তরের গভীরে এই সত্য না বসলে জীবন অস্থিরই থেকে যায়।

যে আল্লাহর হাতে ছিল মুসার পথ, যার হিকমতে ফিরআউনের পরিণতি, যার পরিকল্পনায় দুর্বলদের জন্য উদ্ধার আর অহংকারীদের জন্য লাঞ্ছনা—সেই আল্লাহই আজও জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে সক্রিয়, জীবিত, নিকটবর্তী। তাঁর দিকে ফিরে যাওয়াই মুক্তি; তাঁর হুকুমের সামনে নত হওয়াই শান্তি। সুতরাং অহংকার নয়, বিনয় চাই; দাবি নয়, দাসত্ব চাই; আত্মপ্রশংসা নয়, আল্লাহর হামদ চাই। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা কারও সম্পদের কাছে, কারও ক্ষমতার কাছে, কারও নামের কাছে নয়—ফিরে যাব সেই রবের কাছে, যাঁর কাছে সব হিসাব, সব গোপন কথা, সব অশ্রু, সব তাওবা জমা থাকে।