“আর আপনার পালনকর্তা যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং পছন্দ করেন—তাদের কোনো ক্ষমতা নেই।” এই একটি বাক্য যেন মানুষের অহংকারের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। আমরা কত পরিকল্পনা আঁকি, কত যোগ্যতার হিসাব করি, কত সম্ভাবনার দরজা খুলি; কিন্তু শেষ ফয়সালা মানুষের হাতে নয়। এই আয়াত হৃদয়কে স্মরণ করিয়ে দেয়: সৃষ্টির শুরু যেমন আল্লাহর, তেমনি বাছাইয়ের অধিকারও একান্ত তাঁর। কে নবী হবে, কে রাজা হবে, কে নিপীড়িত হবে, কে নাজাত পাবে—ইতিহাসের এই গভীর স্রোত মানুষের ইচ্ছায় নয়; রবের ইখতিয়ারেই প্রবাহিত হয়।
সূরা আল-কাসাসের বিস্তৃত পরিসরে মূসা আলাইহিস সালামের জীবন, ফিরআউনের দম্ভ, আর কারূনের সম্পদের অহংকার—সবকিছু মিলিয়ে এ আয়াতের অর্থ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এখানে কেবল একটি তাত্ত্বিক ঘোষণা নেই; আছে জীবন্ত ইতিহাসের ভাষ্য। যাদের হাতে শক্তি ছিল, তারা ভেবেছিল নিয়ন্ত্রণ তাদের; যাদের হাতে ধন ছিল, তারা ভেবেছিল উচ্চতা তাদের। অথচ আল্লাহ দেখিয়ে দেন—ক্ষমতা, রাজত্ব, সম্পদ, নিরাপত্তা, সম্মান—কোনোটিই মানুষের স্থায়ী মালিকানা নয়। তিনি যাকে ইচ্ছা দেন, যাকে ইচ্ছা ফিরিয়ে নেন, আর যাকে চান তাঁর হিকমতে নির্বাচিত করেন।
এর পরেই আসে তাওহীদের অপরাজেয় ঘোষণা: “আল্লাহ পবিত্র, এবং তারা যাকে শরীক করে তা থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে।” অর্থাৎ সৃষ্টি ও নির্বাচন যখন একমাত্র তাঁর, তখন ইবাদত, ভয়, আশা, সমর্পণ—সবই তাঁরই প্রাপ্য। মানুষের বানানো ইলাহ, ক্ষমতার মূর্তি, স্বার্থের দেবতা, অহংকারের আড়াল—সবই ভেঙে পড়ে এই আয়াতের সামনে। এই আয়াত আমাদের শেখায়, তাকদির মানে অন্ধ নিয়তি নয়; বরং এমন এক রবের জ্ঞানময় পরিকল্পনা, যিনি ভুল করেন না, কারও ওপর জুলুম করেন না, এবং বান্দার চোখে যা অন্ধকার, তাঁর কাছে তা-ই হতে পারে হিদায়াতের গোপন দরজা।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের পরিকল্পনা হঠাৎই ক্ষুদ্র হয়ে যায়। আমরা নিজের জীবনকে অনেকখানি নিজের হাতে ধরে আছি বলে ভাবি, অথচ এক একটি শ্বাসও আমাদের কবজায় নয়। আল্লাহ সৃষ্টি করেন, আর সেই সৃষ্টির ভেতর থেকে যাকে চান বেছে নেন; কোথায় কার আগমন, কার উত্থান, কার পতন, কার মাধ্যমে রহমত, কার মাধ্যমে শিক্ষা—সবই তাঁর হিকমতের অন্তরালে বাঁধা। মূসা আলাইহিস সালামের জীবনে এ সত্য এমনভাবে জ্বলে উঠেছে যে, ফেরাউনের প্রাসাদও তাকে থামাতে পারেনি, আর কোনো মানবরচিত শক্তিও আল্লাহর নির্ধারিত পথকে রোধ করতে পারেনি। মানুষ নিজের হাতে যে দরজা বন্ধ করে, রব সেই দরজা থেকেই আরেকটি বড় দরজা খুলে দেন।
আরবির এই ঘোষণায় তাওহীদের গভীরতম আলো জ্বলে ওঠে: আল্লাহ পবিত্র, মহিমান্বিত, তাদের সব কল্পিত অংশীদারিত্ব থেকে বহু ঊর্ধ্বে। মানুষ কখনো ক্ষমতাকে, কখনো সম্পদকে, কখনো বংশকে, কখনো নিজের বুদ্ধিকে ইলাহ বানিয়ে ফেলে; কিন্তু এই আয়াত যেন সব ভ্রান্ত ভরসার ওপর এক আসমানি আঘাত। তোমার জীবনে যা কিছু ঘটছে, তা শুধু ঘটনামাত্র নয়; তার পেছনে আছে রবের নির্বাচন, রবের পরিকল্পনা, রবের অদৃশ্য পরিচালনা। তাই মুমিনের হৃদয় যখন এ আয়াত ধারণ করে, তখন সে আর জিজ্ঞেস করে না, ‘আমার হাতে কী আছে?’ সে বলে, ‘আমার রব কী চান?’ আর এই এক প্রশ্নই মানুষকে দাসত্বের অন্ধকার থেকে ইমানের প্রশান্ত আলোতে পৌঁছে দেয়।
এই আয়াতের সামনে দাঁড়ালে মানুষের ভেতরের সব কৃত্রিম জোর যেন ধীরে ধীরে নেমে আসে। আমরা অনেক সময় নিজের বুদ্ধি, বংশ, পদ, অর্থ, যোগ্যতা—এসবকে ভাগ্যের লাগাম ভেবে নিই; যেন আমরাই নিজের ইতিহাসের মালিক। কিন্তু কুরআন মৃদু অথচ চূড়ান্তভাবে বলে দেয়, আল্লাহ যা চান সৃষ্টি করেন এবং নির্বাচন করেন। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি দরজা, প্রতিটি স্থগিত আশা, প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত দান, প্রতিটি ছিনিয়ে নেওয়া নিরাপত্তা—সবই সেই মহান ইখতিয়ারের অন্তর্ভুক্ত, যিনি ভুল করেন না, যাঁর ফয়সালা অবিচার নয়। তাই মূসা আলাইহিস সালামের জীবন আমাদের শেখায়: মানুষ যতই দুর্বল হোক, আল্লাহর নির্বাচনে সে শক্তিশালী হতে পারে; আর ফিরআউনের মতো ক্ষমতাবানও আল্লাহর সামনে তুচ্ছ হয়ে যেতে পারে।
এই সত্য সমাজের বুকের ওপরও ভারি আঘাত হানে। কারণ মানুষের সমাজে সাধারণত যার ধন বেশি, কণ্ঠ বেশি, অস্ত্র বেশি, তার কথাই যেন শেষ কথা হয়ে দাঁড়ায়। কারূনের সম্পদ তাই শুধু সম্পদ ছিল না; ছিল হৃদয়ের রোগের নাম। ফিরআউনের রাজত্ব শুধু রাজত্ব ছিল না; ছিল সৃষ্টির ওপর রব হওয়ার অসুস্থ আকাঙ্ক্ষা। আর এই আয়াত সেই অসুস্থ অহংকারের উপর তাওহীদের ছুরি চালায়: মানুষের কোনো চূড়ান্ত ‘খিয়ারা’ নেই। আল্লাহই জানেন কাকে কোথায় রাখলে তার জন্য পরীক্ষা, কার জন্য দয়া, কার জন্য উত্থান, কার জন্য পতন। তাই মুমিনের কাজ গর্ব করা নয়; বরং নিজের অবস্থানকে আমানত মনে করে কেঁপে ওঠা—আমি কোথা থেকে পেলাম, কেন পেলাম, আর কীভাবে ব্যবহার করছি?
এখানে ভয়ও আছে, আবার আশাও আছে। ভয় এই কারণে যে, যে রব নির্বাচন করেন, তাঁর সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ যেতে পারে না; আর আশা এই কারণে যে, সেই রবই দয়া করেন, পথ দেখান, দুর্বলকে তুলে ধরেন, তওবার দরজা খোলা রাখেন। তাই এই আয়াত হৃদয়কে বলে: নিজের ইচ্ছাকে উপাস্য কোরো না, নিজের পছন্দকে সত্যের মানদণ্ড বানিও না, এবং দুনিয়ার দৃশ্যমান শক্তিকে চূড়ান্ত ভেবো না। ফিরে এসো সেই আল্লাহর দিকে, যিনি সৃষ্টি করেন, বাছাই করেন, পরিচালনা করেন। তিনিই পবিত্র, তিনিই উচ্চ, তারা যাকে শরীক করে তিনি তা থেকে বহু ঊর্ধ্বে। এই উপলব্ধি যখন অন্তরে নেমে আসে, তখন মানুষ আর নিজের জন্য নয়—রবের জন্য বাঁচতে শেখে; আর জীবন, ইতিহাস ও তাকদির সবকিছুই এক অসাধারণ সিজদার অর্থ লাভ করে।
এই সত্যের সামনে মানুষকে অবশেষে নত হতে হয়: আমি যা চাই, তা-ই হবে—এ কথা বলার অধিকার কোনো বান্দার নেই। মূসা আলাইহিস সালামকে নীলনদের বুক দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা যেমন আল্লাহর পরিকল্পনা, তেমনি ফিরআউনের অহংকারকে ডুবিয়ে দেওয়া, আর কারূনের ধনভাণ্ডারকে মাটির গর্ভে গিলে ফেলা—সবই সেই এক মহাপ্রভুর ইচ্ছার বিস্তার। মানুষ কখনো ভাবে, তার বুদ্ধি দিয়ে ভাগ্যকে বেঁধে ফেলবে; কিন্তু আয়াতটি নিঃশব্দে জানিয়ে দেয়, সৃষ্টির রহস্যও তাঁর, বাছাইয়ের রহস্যও তাঁর, এবং যে কিছুই তাঁর হিকমতের বাইরে নয়।
তাই মুমিনের হৃদয় এখানে এক অদ্ভুত শান্তি ও কাঁপুনিতে ভরে ওঠে। শান্তি, কারণ তার রব অন্ধভাবে শাসন করেন না; তিনি জ্ঞান, দয়া ও প্রজ্ঞার সঙ্গে নির্বাচন করেন। কাঁপুনি, কারণ সেই নির্বাচনের সামনে আমাদের সব কৃত্রিম গৌরব ভেঙে পড়ে। আজ যে ক্ষমতা হাতে আছে, তা স্থায়ী সিংহাসন নয়; আজ যে সুযোগ এসেছে, তা চিরস্থায়ী মালিকানা নয়। আল্লাহ পবিত্র, তিনি সব শরিকত্বের ঊর্ধ্বে। মানুষ যদি সত্যিই এ আয়াতের সামনে দাঁড়ায়, তবে তার অহংকার গলে যাবে, তার দুঃশ্চিন্তা নরম হবে, আর তার অন্তর বলবে—হে রব, আমি বুঝেছি; আমার ইচ্ছা নয়, আপনার ইচ্ছাই আমার আশ্রয়।