কিয়ামতের সেই কঠিন মুহূর্তে, যখন মিথ্যার সমস্ত প্রাচীর ভেঙে পড়বে, তখন গোমরাহি-প্রদর্শক আর গোমরাহি-গ্রাহীদের সম্পর্কের আসল চেহারা প্রকাশ পাবে। এ আয়াতে তারা বলছে, হে আমাদের রব, এদেরকেই তো আমরা পথভ্রষ্ট করেছিলাম; যেমন আমরাও পথভ্রষ্ট ছিলাম। অর্থাৎ, তারা নিজেদের অপরাধ চাপা দিতে চায়, দায়টা ছড়িয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহর দরবারে কোনো প্ররোচনা চিরকাল ঢেকে রাখা যায় না। মানুষ দুনিয়ায় যাকে অনুসরণ করেছে, যাকে নেতা ভেবেছে, যাকে আশ্রয় ভেবেছে, আখিরাতে সে সম্পর্কও পরীক্ষা হবে। সেখানে মিথ্যা আনুগত্যের ভাষা থাকবে না; থাকবে শুধু সত্য, আর সেই সত্যের সামনে সকল অজুহাত নিঃস্ব হয়ে যাবে।
কিন্তু আয়াতটি আরও গভীর। তারা বলছে, আমরা আপনার সামনে দায়মুক্ত হচ্ছি, তারা তো আমাদেরই ইবাদত করত না। এখানে এক ধরনের নির্মম বিচ্ছেদ ধ্বনিত হয়—পথপ্রদর্শক ও অনুসারী, নেতা ও জনতা, প্ররোচক ও প্ররোচিত; সবাই যখন শাস্তির মুখোমুখি হবে, তখন কেউ কারও ভার বহন করতে চাইবে না। কুরআন বারবার এই বাস্তবতাকে জাগিয়ে তোলে, যেন মানুষ বুঝে নেয় যে বিশ্বাস, অনুসরণ, আনুগত্য—এসব কেবল সামাজিক সম্পর্ক নয়, এগুলোর একটি নৈতিক ও আখিরাত-ভিত্তিক জবাবদিহি আছে। কেউ কাউকে জোর করে ঈমানহীন করতে পারে না, আবার কেউ স্বেচ্ছায় মিথ্যার কাছে মাথা নত করে পরে সম্পূর্ণ অজুহাতও দাঁড় করাতে পারবে না।
সূরা আল-কাসাসের সামগ্রিক সুরের ভেতরে এই আয়াতটি বিশেষভাবে হৃদয় কাঁপায়। মূসা আলাইহিস সালামের কাহিনিতে ফিরআউনের অহংকার, কারূনের সম্পদের মোহ, আর শক্তি ও ক্ষমতার ভুল ব্যবহার বারবার আমাদের শেখায়—আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে অনেক উঁচু, অনেক সূক্ষ্ম, অনেক অপ্রতিরোধ্য। এই আয়াতও সেই সত্যেরই আরেক মুখ: যে পথভ্রষ্টতা দুনিয়ায় দল বেঁধে চলে, আখিরাতে তা একা পড়ে যায়। আজ যে হাত ধরে টানে, কাল সে হাত ছেড়ে দেবে; আজ যে নামে ডাকে, কাল সেই নাম অচেনা হয়ে যাবে। তাই কুরআন আমাদের কেবল ভবিষ্যতের ভয় দেখায় না, বর্তমানের পথও শুদ্ধ করে দেয়—কার সামনে নত হচ্ছি, কাকে অনুসরণ করছি, কোন স্বরে আমার হৃদয় সাড়া দিচ্ছে—এসব প্রশ্ন একদিন অবশ্যই হিসাবের পাতায় ফিরে আসবে।
কিয়ামতের ময়দানে অনেক মুখোশ খুলে যাবে, আর এই আয়াত সেই উন্মোচনেরই কঠিন দৃশ্য। যারা মানুষকে গোমরাহির দিকে টেনেছিল, যারা ভ্রান্তিকে সাজিয়ে আকর্ষণীয় করেছিল, তারা সেদিন আর দায় নেবে না—বরং নিজেরাই বলবে, হে আমাদের রব, এদেরকেই আমরা বিভ্রান্ত করেছি; আমরা যেমন বিভ্রান্ত ছিলাম, তারাও তেমনি আমাদের পথে চলেছে। দুনিয়ায় যত বড় প্রভাব, যত জোরালো ডাক, যত মোহনীয় ভ্রান্তি—শেষ বিচারে তা সবই ভেঙে পড়বে। মানুষের হাতে গড়া অনুসরণ, মানুষের হাতে গড়া বিশ্বাস, মানুষের হাতে গড়া আনুগত্য এক মুহূর্তেই নির্জীব হয়ে যাবে। তখন বোঝা যাবে, পথভ্রষ্টতার শিকড় শুধু দুর্বল অনুসারীর মধ্যে ছিল না; ছিল প্ররোচনার পাপ, অহংকারের বিষ, আর সত্যকে ঢেকে ফেলার নিষ্ঠুরতা।
এই আয়াত আমাদের অন্তরকে নাড়া দিয়ে জিজ্ঞেস করে, আমরা কার ডাকে চলছি, কার কথায় সত্যকে ম্লান করছি, কার ভালোবাসায় আল্লাহর সীমাকে ভুলে যাচ্ছি? কারণ কিয়ামতের দিনে অন্ধ অনুসরণ কোনো সুরক্ষা নয়; তাকদিরের পর্দার আড়ালেও আল্লাহর পরিকল্পনা নিখুঁত ন্যায়বিচার নিয়ে এগিয়ে যায়। ফেরাউনের গর্ব, কারূনের ধন, দম্ভী নেতার আহ্বান, ভ্রান্ত সঙ্গের আসর—সবই একদিন বিচ্ছিন্ন হবে। তখন টিকে থাকবে শুধু ঈমানের সত্যতা, তাওহীদের দৃঢ়তা, এবং সেই হৃদয়ের কান্না, যে হৃদয় দুনিয়াতেই বলে উঠেছিল: হে আমার রব, আমাকে সত্যের পথে রাখুন, যাতে আমি কারও হাতে গড়া বিভ্রান্তির দাস না হই।
কিয়ামতের দিন যখন সত্যের ন্যায়ভ্রষ্ট নীরবতা নেমে আসবে, তখন যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল, তারাও নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইবে। তারা বলবে, হে আমাদের রব, এদেরকেই তো আমরা পথভ্রষ্ট করেছিলাম; আমরাও যেমন পথভ্রষ্ট ছিলাম, তেমনই তাদেরও টেনে নিয়েছিলাম। এ কথা শুনে মনে হয়, যেন শেকড় থেকে উপড়ে ফেলা এক মিথ্যা আশ্রয়ের আর্তনাদ। দুনিয়ায় মানুষ কত সহজে অনুসরণ করে—কথায়, প্রবণতায়, ক্ষমতার মোহে, ভিড়ের উষ্ণতায়, চোখধাঁধানো অহংকারে। কিন্তু আখিরাতে কোনো নেতা তার অনুসারীর পাপ বহন করবে না, কোনো অনুসারীও অন্ধ অনুসরণের অজুহাতে রেহাই পাবে না। সেখানে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু আত্মরক্ষা থাকবে না; সঙ্গ থাকবে, কিন্তু আশ্রয় থাকবে না।
আয়াতের ভেতরে আছে এক ভয়ংকর বিচ্ছেদ: আমরা আপনার সামনে দায়মুক্ত হচ্ছি। মানুষ যে মানুষকে দুনিয়ায় উপাস্য বানায়, সেটা শুধু সিজদা দিয়ে নয়; কখনও কথাকে সত্যের ওপরে বসিয়ে, কামনাকে নীতির ওপরে বসিয়ে, দলকে হকের ওপরে বসিয়ে, স্বার্থকে আল্লাহর বিধানের ওপরে বসিয়ে। এভাবেই সমাজে গোমরাহি ছড়ায়, পরিবারে অন্ধকার নামে, অন্তরে হালাল-হারামের সীমা মুছে যেতে থাকে। কিন্তু কিয়ামতের আদালতে কেউ আর কারও গলায় হাত দিয়ে বলবে না, আমাকে বাঁচাও। সেদিন প্রতিটি আত্মা একা হবে, অথচ সেই একাকিত্বই হবে ন্যায়বিচারের সবচেয়ে কঠিন প্রকাশ। মানুষ বুঝে যাবে—পথভ্রষ্টতা কেবল একটি ভুল চিন্তা নয়, এটি এমন এক আগুন, যা শেষ পর্যন্ত প্ররোচনাকারী ও প্ররোচিত উভয়কেই গ্রাস করে।
তবু এই আয়াতের কাঁপন আমাদের জন্য শুধুই ভয় নয়; এর মধ্যে আছে জেগে ওঠার আহ্বান। আল্লাহর পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় না, তাঁর জ্ঞানকে কেউ ফাঁকি দিতে পারে না। মূসার জীবনের মতোই, ফেরাউনের দম্ভ, কারূনের সম্পদের অহংকার, আর ভিড়ের ভ্রান্ত আনুগত্য—সবই একদিন সত্যের সামনে ভেঙে পড়ে। তাই আজই নিজের হিসাব শুরু করতে হয়: আমি কাকে শুনছি, কাকে অনুসরণ করছি, কোন কণ্ঠ আমার ঈমানকে নরম করছে, কোন আকর্ষণ আমাকে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। যে হৃদয় নিজের ভুলের সামনে নত হতে শেখে, সে-ই রক্ষা পায়। আর যে হৃদয় আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, সে বুঝতে পারে—দুনিয়ার সব মিথ্যা নেতা একদিন দায় অস্বীকার করবে, কিন্তু দয়াময় রবের দরজা খোলা থাকে, তওবার জন্য, ফেরাের জন্য, নতুন করে সত্যকে আঁকড়ে ধরার জন্য।
কিয়ামতের দিন যখন মুখোশ খুলে যাবে, তখন সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য হবে এই যে, মানুষ যাদের হাতে নিজের আত্মাকে সঁপে দিয়েছিল, তারা নিজেরাই দায় এড়িয়ে যাবে। যারা ভ্রষ্টতা ছড়িয়েছিল, তারা বলবে—আমরাও তো পথ হারিয়েছিলাম, এদেরকেও আমরা তেমনই হারিয়েছি; কিন্তু এখন আমরা তোমার সামনে দায়মুক্ত। এ যেন মানুষের তৈরি সব মিথ্যা আশ্রয়ের শেষ পরিণতি। দুনিয়ায় যে নেতৃত্ব বাহবা পায়, যে প্ররোচনা অনুসরণ পায়, যে ভ্রান্তি সংখ্যায় শক্তি পায়, আখিরাতে সেগুলোর কোনোটাই মানুষের পক্ষে দাঁড়াবে না। সেখানে না থাকবে সখ্য, না থাকবে দম্ভ; থাকবে শুধু অপরাধীর নগ্ন সত্য, আর আল্লাহর সামনে অসহায় নীরবতা।
সূরা আল-কাসাস আমাদের মুসা আলাইহিস সালামের কাহিনির ভেতর দিয়ে বারবার মনে করিয়ে দেয়—ফিরআউনের অহংকারও শেষ পর্যন্ত গুঁড়িয়ে গেছে, কারূনের সম্পদও তাকে বাঁচাতে পারেনি, আর এখন পথভ্রষ্টতার নেতারাও নিজেদের অনুসারীদের অস্বীকার করছে। এ সবই আল্লাহর পরিকল্পনার সামনে মানুষের সীমাহীন দুর্বলতার দলিল। যে দেখে সে বুঝে: ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, প্রভাব ক্ষণস্থায়ী, ভ্রান্ত মতের উল্লাসও ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু রবের হুকুম চিরস্থায়ী। তাই আজই হৃদয়কে জাগাতে হবে—কার কথা শুনে চলছি, কাকে অনুসরণ করছি, কোন পথে নিজের রবের কাছে ফিরছি? আখিরাতের সেই ভাঙা সম্পর্কের আগে যদি দুনিয়াতেই আমরা তওবা করে ফিরতে পারি, তবে এ আয়াত ভয় নয়, হিদায়াত হবে; ধ্বংসের খবর নয়, রক্ষার দরজা হবে।