ফেরাউন জমিনে উদ্ধত হয়েছিল—এই একটি বাক্যেই জড়িয়ে আছে ক্ষমতার সব নেশা, অহংকারের সব অন্ধকার। আল্লাহ তাআলা জানিয়ে দিচ্ছেন, জুলুম কখনো হঠাৎ জন্ম নেয় না; সে আগে হৃদয়ে অহমিকার বীজ বোনে, তারপর সমাজকে ছিন্নভিন্ন করে, মানুষকে দলে দলে ভাগ করে, আর দুর্বলদের ঘাড়ে শক্তির বুটচিহ্ন বসিয়ে দেয়। এই আয়াতে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল অতীতের একটি শাসকের কাহিনি নয়; এটি এমন এক মানসিকতার প্রতিকৃতি, যা মানুষের উপর মানুষকে প্রভু বানায় এবং নিজেকে ভুলে যায় যে প্রকৃত মালিক আল্লাহ।

সে তাদের একটি দলকে দুর্বল করে দিয়েছিল, তাদের পুত্রসন্তানদের হত্যা করত, নারীদের জীবিত রাখত—এই নিষ্ঠুরতার মধ্যে কেবল রাজনৈতিক দমন নয়, এক জাতির অস্তিত্ব মুছে ফেলার কুৎসিত পরিকল্পনাও ছিল। বনী ইসরাইলকে ভেঙে, হেয় করে, নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে রাখার এই বাস্তবতা মূসা আলাইহিস সালামের জীবনের পটভূমি প্রস্তুত করছিল। আল-কাসাসের এই সূচনায় আমরা বুঝতে পারি, নবীর আগমন কোনো শূন্য আকাশে হয় না; অত্যাচারের জমিনেই হিদায়াতের বীজ অঙ্কুরিত হয়, আর দুর্বলদের কান্নার ভেতরেই আল্লাহর নাজাতের ডাক ধীরে ধীরে জাগতে থাকে।

আয়াতের শেষে বলা হয়েছে, সে ছিল অনর্থ সৃষ্টিকারীদের একজন। অর্থাৎ, তার শাসন শুধু কঠোর ছিল না; তা ছিল নৈতিকভাবে বিপর্যস্ত, সমাজকে ভেঙে দেওয়ার মতো ফাসাদে পূর্ণ। এখানেই কুরআনের গভীর শিক্ষা: মানুষের হাতে সাময়িক শক্তি উঠলে সে ভাবতে পারে ইতিহাস তার মুঠোয়, অথচ ইতিহাসের আসল কলম তো রহমানের হাতে। ফেরাউনের জুলুম যতই ভয়াবহ হোক, তার ভেতর দিয়েই আল্লাহ এমন এক পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছিলেন, যা শেষে সত্যকে বিজয়ী করবে এবং মজলুমের জন্য মুক্তির দরজা খুলে দেবে।

ফেরাউনের এ উত্থান কেবল সিংহাসনের উঁচু বসার নাম ছিল না; ছিল হৃদয়ের পতন, আত্মার বিকৃতি, আর রবের সীমা লঙ্ঘনের নাম। সে মানুষকে দলে দলে ভাগ করল, যেন সমাজকে এমনভাবে ছিঁড়ে ফেলা যায় যে দুর্বলদের আর দাঁড়াবার শক্তি না থাকে। জুলুমের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ তখনই প্রকাশ পায়, যখন তা শুধু শাসন করে না, বরং মানুষের পরিচয়, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ—সবকিছুকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চায়। পুত্রসন্তান হত্যা আর নারীদের জীবিত রাখা—এই নিষ্ঠুরতা কেবল রক্তপাত নয়, এটি এক জাতির আশা কেটে ফেলার চেষ্টা, আগামীর শিকড় উপড়ে ফেলার পৈশাচিক আয়োজন। ফেরাউন ভেবেছিল, মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করলে ইতিহাসও তার হয়ে যাবে; কিন্তু ইতিহাস কখনো জালিমের নয়, ইতিহাস সবসময় আল্লাহর।

এখানেই আয়াতের অন্তর্নিহিত কম্পন—আল্লাহ আমাদের শেখাচ্ছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন অন্ধকারেও তিনি নীরব নন। ফেরাউন জুলুমের পরিকল্পনা করছিল, অথচ সেই জুলুমই মূসা আলাইহিস সালামের আগমনের মঞ্চ প্রস্তুত করছিল। যা মানুষের চোখে দুর্বলতার গল্প, আল্লাহর কুদরতে তা হয়ে ওঠে নাজাতের সূচনা। মানুষ কখনো কখনো ভাবে, ক্ষমতাই শেষ কথা; কিন্তু তাকদিরের কিতাবে শেষ কথা শুধু আল্লাহর। তিনি চাইলে শাসকের অহংকারকেও দুর্বলতার আয়নায় ভেঙে দেন, আর এক লুপ্তপ্রায় পরিবার থেকেই দাঁড় করিয়ে দেন এমন এক নবী, যাঁর মাধ্যমে দমন-পীড়নের মূলে আঘাত নেমে আসে। জুলুমের রাত যত গভীর হয়, আল্লাহর ফয়সালার ভোর ততই নিকটবর্তী হয়ে ওঠে।
ফেরাউনের এই কাহিনি কেবল এক স্বৈরাচারের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের ভেতরের সেই ভয়ংকর প্রবণতারও আয়না, যেখানে ক্ষমতা পেলে সে নিজেকে আইন, নিজের খেয়ালকে ন্যায়, আর নিজের ভয়কে রাষ্ট্রনীতি বানিয়ে ফেলে। আল্লাহ তাআলা দেখিয়ে দিচ্ছেন, সমাজ যখন দলে দলে বিভক্ত হয়, যখন এক শ্রেণি আরেক শ্রেণির ঘাড়ে পা দিয়ে দাঁড়াতে শেখে, তখন জুলুম শুধু শাসকের হাতে থাকে না—সে সমাজের শ্বাসপ্রশ্বাসে মিশে যায়। দুর্বলকে দুর্বলতর করা, তাকে কণ্ঠহীন করা, তার সন্তানকে হত্যা করা, নারীদের বেঁচে থাকার মধ্যেও বন্দিত্বের স্বাদ জুড়ে দেওয়া—এ সবই এমন এক নৃশংসতা, যা মানুষের আত্মাকে পাথর করে দেয়। আর এই পাথর-হৃদয়ই পরে নিজের পতনকে অদৃষ্টে নয়, নিজের হাতে ডেকে আনে।

এই আয়াত আমাদের কেবল ফেরাউনকে ধিক্কার দিতে বলে না; আমাদের নিজের অন্তরের ফেরাউনটিকেও চিনতে বলে। আমি যখন কারও দুর্বলতাকে উপহাস করি, যখন শক্তি পেয়ে অন্যকে ছোট করি, যখন ক্ষমতা, সম্পদ, বংশ, দল বা প্রভাবের জোরে মানুষের মর্যাদা মাপতে বসি—তখন আমার ভেতরেও কি ফেরাউনের ছায়া নড়ে না? কিন্তু ভয় আর আশার মাঝখানে কুরআন আমাদের দাঁড় করায় এই সত্যে: ইতিহাসের উপরে মানুষের জোর নয়, আল্লাহর ইচ্ছা চলে। ফেরাউন নিজেকে উঁচু করেছিল, আর আল্লাহ তার গর্বকেই তার পতনের সিঁড়ি বানিয়ে দিলেন। যাদেরকে সে দুর্বল করে রাখতে চেয়েছিল, তাদের মধ্য থেকেই নাজাতের পথ বের হবে—এটাই তাকদিরের বিস্ময়, আর মুমিনের হৃদয়ে এই আয়াত সেই বিশ্বাসই জাগায়: জুলুম যতই গর্জাক, রবের পরিকল্পনা নীরবে, নিখুঁতভাবে, অমোঘভাবে এগিয়ে চলেছে।

ফেরাউন ভেবেছিল, মানুষকে ভাগ করলে সত্যও টুকরো হয়ে যাবে; দুর্বলকে পিষ্ট করলে ইতিহাসও নীরব হয়ে থাকবে। কিন্তু আল্লাহর কুদরতের বিরুদ্ধে কোনো জুলুমই স্থায়ী হতে পারে না। যে শক্তি নিজেকে জমিনের মালিক মনে করে, সেই শক্তির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে পতনের বীজ। আর আল্লাহ যখন কোনো জাতির ওপর রহমতের দরজা খুলতে চান, তখন অত্যাচারের গভীর রাতই কখনো কখনো ভোরের প্রথম আলোর সাক্ষী হয়ে যায়। এই আয়াতে তাই শুধু এক শাসকের অপরাধ নেই; আছে ক্ষমতার মদে মানুষের মানবতা হারানোর হুঁশিয়ারি, আছে দুর্বলদের অশ্রুর পাশে আল্লাহর নীরব কিন্তু অমোঘ উপস্থিতি।

মুসা আলাইহিস সালামের কাহিনির পটভূমি এভাবেই আমাদের সামনে খুলে যায়—দমন, ভয়, রক্ত, হাহাকার, আর সেই হাহাকারের ওপর দাঁড়িয়ে তাকদিরের বিস্ময়কর নির্মাণ। মানুষ পরিকল্পনা করে, আল্লাহও পরিকল্পনা করেন; আর আল্লাহই সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী। তাই জুলুম যখন খুব উঁচু হয়ে ওঠে, তখন মুমিনের চোখে তা ভয় জাগালেও অন্তরে জন্ম দেওয়া উচিত ভরসা—রব কখনো অন্ধকারকে চূড়ান্ত হতে দেন না। আজ যদি আমরা এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের হৃদয়কে জিজ্ঞেস করি, আমি কি কখনো ক্ষমতায়, কথায়, অর্থে, অবস্থানে কারও ওপর ফেরাউনের মতো কঠোর হয়েছি? যদি হয়ে থাকি, তবে এখনও ফিরবার সময় আছে। কেননা আল্লাহর সামনে অহংকার টেকে না, আর তাওবার সামনে সবচেয়ে অন্ধকার হৃদয়ও একদিন নরম হয়ে যেতে পারে।