এই আয়াতের ভাষা পুনরায় বনী ইসরাঈলকে সম্বোধন করছে। সুরা বাকারার শুরু থেকে আল্লাহ বারবার তাদের অতীত ইতিহাস, নবীদের ধারাবাহিকতা, আসমানি কিতাব, মুক্তি, রিজিক, ক্ষমা, সুযোগ ও নেতৃত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এখানে আবার বলা হচ্ছে—তোমরা সেই নেয়ামত ভুলে যেও না, যা তোমাদের উপর বর্ষিত হয়েছিল। কারণ নেয়ামত ভুলে যাওয়া শুধু স্মৃতির দুর্বলতা নয়; এটি আত্মার এক ভয়ংকর অকৃতজ্ঞতা।

বনী ইসরাঈল একসময় আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত জাতি ছিল। তাদের মধ্যে বহু নবী প্রেরিত হয়েছেন, তাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে, ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, মরুভূমিতে মান্না ও সালওয়া দেওয়া হয়েছে, মেঘের ছায়া দেওয়া হয়েছে, পথপ্রদর্শন দেওয়া হয়েছে। এই শ্রেষ্ঠত্ব ছিল কোনো বংশগত অহংকারের সনদ নয়; এটি ছিল দায়িত্ব, আমানত এবং আল্লাহর বিধানের প্রতি আনুগত্যের পরীক্ষা।

কিন্তু মানুষ যখন নেয়ামতকে অধিকার মনে করে, তখন কৃতজ্ঞতা হারিয়ে যায়। আর কৃতজ্ঞতা হারালে নেয়ামতও মানুষের জন্য হেদায়েতের দরজা না হয়ে অহংকারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বনী ইসরাঈলের ভুল এখানেই—তারা আল্লাহর দানকে নিজেদের জন্মগত শ্রেষ্ঠত্ব মনে করেছিল; অথচ আল্লাহর কাছে মর্যাদা বংশের নয়, তাকওয়ার। আল্লাহর নৈকট্য রক্তের ধারায় পাওয়া যায় না; পাওয়া যায় ঈমান, আনুগত্য, সত্যনিষ্ঠা এবং আত্মসমর্পণের মাধ্যমে।

এই আয়াত আমাদেরও গভীরভাবে স্পর্শ করে। কারণ প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনোভাবে আল্লাহর নেয়ামতে ডুবে আছে। আমাদের শ্বাস নেয়ামত, দৃষ্টি নেয়ামত, শ্রবণ নেয়ামত, পরিবার নেয়ামত, রিজিক নেয়ামত, নিরাপত্তা নেয়ামত, ঈমান নেয়ামত, কুরআন নেয়ামত, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মত হওয়া নেয়ামত। কিন্তু আমরা কত দ্রুত ভুলে যাই! যে দেহে অসংখ্য অদৃশ্য দান প্রতিক্ষণ কাজ করছে, সেই দেহ দিয়েই আমরা কখনও আল্লাহর অবাধ্যতা করি। যে জিহ্বা আল্লাহ দিয়েছেন, সেই জিহ্বা দিয়ে অভিযোগ করি। যে চোখ আল্লাহ দিয়েছেন, সেই চোখ দিয়ে নিষিদ্ধ পথে তাকাই। যে সময় আল্লাহ দিয়েছেন, সেই সময় আল্লাহকেই ভুলে কাটাই।

নেয়ামত স্মরণ করা মানে শুধু “আলহামদুলিল্লাহ” বলা নয়; নেয়ামত স্মরণ করা মানে নেয়ামতকে আল্লাহর পথে ব্যবহার করা। চোখের কৃতজ্ঞতা হলো পবিত্র দৃষ্টি। জিহ্বার কৃতজ্ঞতা হলো সত্য কথা ও যিকির। সম্পদের কৃতজ্ঞতা হলো হালাল ব্যবহার ও মানুষের হক আদায়। জ্ঞানের কৃতজ্ঞতা হলো বিনয়। ক্ষমতার কৃতজ্ঞতা হলো ন্যায়। ঈমানের কৃতজ্ঞতা হলো আনুগত্য।

আল্লাহ যখন বলেন, “আমার নেয়ামত স্মরণ করো”—তখন এর ভেতরে এক নীরব প্রশ্ন আছে: তুমি যা পেয়েছ, তা কোথা থেকে পেয়েছ? তুমি যে নিজেকে বড় ভাবছ, তোমার বড়ত্বের উপাদানগুলো কি তোমার নিজের তৈরি? তোমার বুদ্ধি, তোমার সুযোগ, তোমার পরিবার, তোমার স্বাস্থ্য, তোমার রিজিক, তোমার জীবন—সবই কি তোমার অর্জনের আগে আল্লাহর দান নয়?

মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, সে দানের ভিতের উপর দাঁড়িয়ে দাতাকে ভুলে যায়। সে আল্লাহর দেওয়া মাটিতে দাঁড়িয়ে আল্লাহর বিরুদ্ধেই অহংকার করে। সে আল্লাহর দেওয়া রিজিক খেয়ে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে। সে আল্লাহর দেওয়া সময় নিয়ে এমনভাবে বাঁচে, যেন সময়ের মালিক সে নিজেই। অথচ এক মুহূর্তে দৃষ্টি চলে যেতে পারে, শ্বাস থেমে যেতে পারে, শক্তি ভেঙে পড়তে পারে, জীবন বদলে যেতে পারে।

“আমি তোমাদেরকে সমগ্র জগতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছিলাম”—এই বাক্য আমাদের শেখায়, শ্রেষ্ঠত্ব কখনও দায়িত্বহীন সম্মান নয়। আল্লাহ যখন কাউকে জ্ঞান দেন, সে জ্ঞানের হিসাব আছে। যখন কাউকে সম্পদ দেন, সে সম্পদের হিসাব আছে। যখন কাউকে নেতৃত্ব দেন, সে নেতৃত্বের হিসাব আছে। যখন কাউকে ঈমান দেন, সেই ঈমানেরও দাবি আছে। নেয়ামত যত বড়, জবাবদিহিও তত বড়।

তাই যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত মনে করে, তার অহংকার বাড়ার কথা নয়; তার ভয় বাড়ার কথা। কারণ নেয়ামত কেবল আনন্দ নয়, পরীক্ষা। সম্পদ পরীক্ষা, সন্তান পরীক্ষা, ক্ষমতা পরীক্ষা, সৌন্দর্য পরীক্ষা, জনপ্রিয়তা পরীক্ষা, জ্ঞান পরীক্ষা, এমনকি দ্বীনের জ্ঞানও পরীক্ষা। কেউ নেয়ামত পেয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, আর কেউ নেয়ামত পেয়ে আল্লাহ থেকে দূরে সরে যায়। পার্থক্য এখানেই।

এই আয়াত আমাদের ভেতরের গাফিলতিকে কাঁপিয়ে দেয়। আমরা অনেক সময় হারানো জিনিসের তালিকা করি, কিন্তু পাওয়া জিনিসের হিসাব করি না। আমরা যা পাইনি, তা নিয়ে কাঁদি; কিন্তু যা পেয়েছি, তার শোকর করি না। অথচ আমাদের জীবনে এমন অসংখ্য নেয়ামত আছে, যা হারানোর আগে আমরা বুঝতেই পারি না। সুস্থতা অসুস্থ হওয়ার আগে বোঝা যায় না। নিরাপত্তা বিপদের আগে বোঝা যায় না। পিতা-মাতা চলে যাওয়ার আগে বোঝা যায় না। ঈমানের মূল্য ফিতনার অন্ধকারে না পড়লে বোঝা যায় না।

বনী ইসরাঈলের ইতিহাস আমাদের জন্য সতর্কতা—আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ পাওয়া মানেই চিরস্থায়ী নিরাপত্তা নয়। যদি কৃতজ্ঞতা না থাকে, আনুগত্য না থাকে, সত্যের প্রতি বিনয় না থাকে, তবে নেয়ামতই মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়। কিতাব পাওয়া যথেষ্ট নয়, কিতাব মানতে হয়। নবীর উম্মত হওয়া গর্বের বিষয়, কিন্তু সেই নবীর সুন্নাহ থেকে দূরে থাকা ভয়ংকর বঞ্চনা। মুসলিম পরিচয় নেয়ামত, কিন্তু সেই পরিচয়ের দাবি পূরণ না করলে তা কিয়ামতের দিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আজ আমাদের নিজেদের জিজ্ঞাসা করা দরকার—আমরা কি আল্লাহর নেয়ামত স্মরণ করি, নাকি শুধু ব্যবহার করি? আমরা কি আল্লাহর দানকে আল্লাহর পথে ফিরিয়ে দিই, নাকি নিজের অহংকারের সাজসজ্জা বানাই? আমরা কি ঈমানকে জীবনের কেন্দ্র করি, নাকি পরিচয়ের নামমাত্র অলংকার করে রাখি?

নেয়ামত স্মরণ করলে হৃদয় নরম হয়। মানুষ বুঝতে শেখে, আমি মালিক নই—আমি প্রাপ্ত। আমি দাবিদার নই—আমি কৃতজ্ঞ বান্দা। আমার হাতে যা আছে, তা আমার শক্তির প্রমাণ নয়; আল্লাহর দয়ার প্রমাণ। আমার সাফল্য আমার একার কৃতিত্ব নয়; অসংখ্য অদৃশ্য অনুগ্রহের ফল।

এই উপলব্ধি মানুষকে ভেঙে দেয়, কিন্তু ধ্বংস করে না; বরং বিনয়ী করে, পবিত্র করে, আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে। তখন মানুষ প্রতিটি নেয়ামতকে প্রশ্ন করে—তুমি আমাকে আল্লাহর দিকে নিচ্ছ, নাকি আল্লাহ থেকে দূরে সরাচ্ছ? আমার সম্পদ কি আমাকে দানশীল করছে, নাকি অহংকারী? আমার জ্ঞান কি আমাকে বিনয়ী করছে, নাকি কঠোর? আমার সময় কি আমাকে আখিরাতের দিকে নিচ্ছে, নাকি দুনিয়ার ঘুমে ডুবাচ্ছে?

এই আয়াতের গভীর আহ্বান হলো—ভুলো না। যে জাতি নেয়ামত ভুলে যায়, সে নিজের পতনের কারণ নিজেই তৈরি করে। যে ব্যক্তি দাতাকে ভুলে দানে মত্ত হয়, তার হৃদয় ধীরে ধীরে শুষ্ক হয়ে যায়। আর যে বান্দা নেয়ামত স্মরণ করে, তার সাধারণ জীবনও ইবাদতে রূপ নেয়।

তাই আজ একটু থামা দরকার। নিজের শ্বাসের দিকে তাকানো দরকার। চোখের আলো, হৃদয়ের ধুকপুক, মায়ের দোয়া, সন্তানের মুখ, রিজিকের ব্যবস্থা, ঘুমের নিরাপত্তা, কুরআনের আলো, ঈমানের ডাক—সবকিছুকে নতুন করে দেখা দরকার। আমরা কত বেশি পেয়েছি! অথচ কত কম শোকর করেছি!

হে আল্লাহ, আমাদের নেয়ামত-ভোলা মানুষ বানাবেন না। আমাদের এমন হৃদয় দিন, যে হৃদয় দানের আড়ালে দাতাকে দেখে। আমাদের এমন জীবন দিন, যেখানে আপনার প্রতিটি নেয়ামত আমাদের অহংকার নয়, শোকর; গাফিলতি নয়, আনুগত্য; দুনিয়ার মোহ নয়, আখিরাতের প্রস্তুতির কারণ হয়ে ওঠে।