কখনও মানুষের ইতিহাসে এমন এক মুহূর্ত আসে, যখন সত্যকে উপদেশ দেওয়ার কাজটাই বিদ্রূপের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই আয়াতে সেই কঠিন দৃশ্য দেখা যায়: একদল বলছে, “এদেরকে কেন নসিহত করো? আল্লাহ তো এদের ধ্বংস করবেনই, কিংবা কঠিন শাস্তি দেবেনই।” আর অন্য পক্ষের জবাব—“তোমাদের রবের সামনে দায়মুক্তি পাওয়ার জন্য, আর এই আশায় যে তারা হয়তো তাকওয়ার পথে ফিরে আসবে।” এখানে কেবল কথা বলা নয়; এখানে ঈমানের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক বিশুদ্ধ দায়িত্বের ঘোষণা আছে। মানুষ বদলাবে কি বদলাবে না, তা জানা আমাদের আয়ত্তে নেই; কিন্তু সঠিক কথা বলা, কল্যাণের পথ দেখানো, অন্তত আমাদের জবাবদিহির দরজায় যেন অন্ধকার জমে না থাকে—এটাই মুমিনের কণ্ঠস্বর।
সূরা আল-আরাফের এই অংশের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট জুড়ে আছে জাতিসমূহের অবাধ্যতা, আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার, এবং অবশেষে পতনের ভয়াবহ পরিণতি। কোথাও আদম-ইবলিসের কাহিনি মানুষকে অহংকারের শিকড় দেখায়, কোথাও নবীদের আহ্বান তাদের জাতির সামনে সত্য ও মিথ্যার বিচ্ছেদরেখা টেনে দেয়, আর কোথাও দেখা যায়—একটি সমাজ ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে নসিহতও ব্যঙ্গের শিকার হয়। এই আয়াত সেই নৈতিক সঙ্কটের গভীরে আমাদের দাঁড় করায়: যখন ভেতর থেকে মনে হয়, “ওদের আর কী হবে,” তখনই কি উপদেশের দরকার সবচেয়ে বেশি নয়? কারণ আল্লাহর ফয়সালা জানা আমাদের কাজ নয়; আমাদের কাজ হলো আলোর পক্ষে থাকা, নীরবতার ছদ্মবেশে সত্যকে ত্যাগ না করা।
আয়াতটি মানবসমাজের একটি অতি সূক্ষ্ম রোগও উন্মোচন করে—অবজ্ঞার ভেতর জন্ম নেওয়া নিষ্ক্রিয়তা। কেউ ভাবে, যাদের পতন নির্ধারিত, তাদের সংশোধনের চেষ্টা কীসের? কিন্তু মুমিনের দৃষ্টি ভিন্ন: সে জানে, নসিহত শুধু ফলাফল বদলানোর জন্য নয়, বরং হৃদয়ের সাক্ষ্যকে সুরক্ষিত রাখার জন্যও। আল্লাহর সামনে দায়মুক্তি—এই বোধ মানুষকে আত্মতুষ্টির ঘুম থেকে জাগায়; আর “হয়তো তারা তাকওয়া অবলম্বন করবে” —এই আশাবাদ মুমিনের হৃদয়কে পাথর হতে দেয় না। এখানে তাকওয়া কেবল ভয় নয়, বরং সেই জেগে থাকা অবস্থা, যেখানে মানুষ রবের সামনে নিজের অবস্থান অনুভব করে, নিজের ভুল চিনে নেয়, এবং ফিরে আসার দরজা খোলা আছে জেনে কাঁপতে কাঁপতে হলেও সেদিকে এগোয়।
কখনও এমন হয়, চারপাশে অবাধ্যতার ধুলো এত ঘন হয়ে ওঠে যে মানুষ সত্যের কণ্ঠ শুনে আর কেঁপে ওঠে না; বরং প্রশ্ন করে, “এদেরকে নসিহত করেই বা কী হবে?” এই প্রশ্নের মধ্যে শুধু হতাশা নেই, আছে হৃদয়ের কঠিন হয়ে যাওয়া। যেন গুনাহ এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে উপদেশকেই অস্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু কুরআন আমাদের শেখায়, মুমিনের দায়িত্ব ফল দেখে নির্ধারিত নয়; দায়িত্ব নির্ধারিত হয় সত্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক দিয়ে। ফল কী হবে তা আল্লাহর জানা, আমাদের কাজ হলো আল্লাহর বাণীকে বাঁচিয়ে রাখা—নিজের ভেতরেও, মানুষের সামনে দিয়েও।
আর তবু এই আয়াত কঠোরতার ভেতরেও আশার দরজা বন্ধ করে না। “এজন্য যেন তারা তাকওয়ার পথে ফিরে আসে”—এই একটি বাক্য যেন পতনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের জন্য রহমতের শেষ প্রদীপ। কারণ হিদায়াতের রাস্তায় আল্লাহর কাজ হলো হৃদয় খুলে দেওয়া, আর বান্দার কাজ হলো ডাক দিয়ে যাওয়া। কোনো জাতি, কোনো সমাজ, কোনো ব্যক্তি যখন ধ্বংসের কিনারে দাঁড়ায়, তখনও নসিহত নিষ্ফল হয় না; কারণ কখনও একটি সতর্ক বাক্যই ভগ্ন অন্তরে কম্পন জাগায়, আর সেই কম্পনই তওবার প্রথম দরজা হয়ে ওঠে। সূরা আল-আরাফের এই বিস্তৃত সুরে তাই আমরা শুনি—অহংকারের শেষ পরিণতি ধ্বংস, আর তাকওয়ার সূচনা সেই মুহূর্তে, যখন মানুষ ভেতরে ভেতরে স্বীকার করে: আমি আল্লাহর মুখাপেক্ষী, আমি জবাবদিহির অধীন, এবং আমার ফিরে আসার সময় এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।
কখনও একটি সমাজ এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যায়, যেখানে সত্যের পক্ষে কথা বলা আর ফলপ্রসূ কাজ বলে মনে হয় না; বরং তা অস্বস্তি, বিদ্রূপ, এমনকি অবিবেচনার শামিল বলে ধরা হয়। এই আয়াতে সেই কঠিন মনস্তত্ত্বই ধরা পড়ে। একদল মানুষ যেন বলে, এদেরকে নসিহত করে লাভ কী, যখন ধ্বংসের ফয়সালা যেন আগেই ঘনিয়ে এসেছে? কিন্তু মুমিনের জবাব অন্যরকম—আমরা উপদেশ দিই, কারণ আমাদের রবের সামনে কথা বলার দায়িত্ব আছে, আর এই দায়িত্বের বোঝা হালকা করা যায় না। মানুষের হৃদয় যেদিন পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়, সেদিনও নসিহত আলোর মতো থেকেই যায়; হয়তো কারও অন্তরে তা একদিন নরমতার বীজ হয়ে ফুটবে।
এই বাক্যের ভেতরে আছে দায়বদ্ধতার এক গভীর সৌন্দর্য। মুমিন কেবল ফল দেখে কাজ করে না; সে আল্লাহর সামনে নিজের অবস্থানও দেখে। কে বদলাবে, কে বদলাবে না, তা চূড়ান্তভাবে জানে একমাত্র আল্লাহ। কিন্তু বান্দার কাজ হচ্ছে কল্যাণের আহ্বানকে বাঁচিয়ে রাখা, কারণ নীরব থাকা অনেক সময় গাফিলতির সঙ্গে মিশে যায়। আর নসিহতের এই দায়িত্বে শুধু অন্যকে সংশোধন করার বাসনা নেই; এর মধ্যে নিজের আত্মাকেও বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা আছে। যে কথা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বলা হয়, তা কখনও বৃথা যায় না—হয়তো শ্রোতার হৃদয়ে, নয়তো বলিয়ের নিজস্ব হিসাবের পাতায় তা আলো হয়ে লেখা থাকে।
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সমাজের পতন হঠাৎ আসে না; তা শুরু হয় অন্তরের অবজ্ঞা থেকে, তারপর ভাষার কুৎসা, তারপর নীরব সম্মতি, আর শেষে শাস্তির ছায়া। তাই তাকওয়া কেবল ব্যক্তিগত ভক্তি নয়, এটি সমষ্টিগত জাগরণের শ্বাস। কেউ যদি আজও উপদেশ শুনে কেঁপে ওঠে, তবে তার ভেতর এখনো ফিরে আসার দরজা খোলা আছে। আর যে উপদেশ দেয়, সেও যেন অহংকারে না ডুবে; সে যেন জানে, সে নিজেও আল্লাহর দয়া ছাড়া নিরাপদ নয়। এই আয়াতের নীরব আহ্বান তাই হৃদয়ের খুব গভীরে বাজে: ফিরে এসো, যাতে শেষ দিনের আগে অন্তর জেগে ওঠে; কারণ আখিরাতের আদালতে সবচেয়ে মূল্যবান হবে সেই অন্তর, যে ভয় পেয়েছিল, আর সেই মুখ, যে সত্য বলতে লজ্জা পায়নি।
কত সমাজ ভেবেছিল, তাদের পতন হবে না; কত হৃদয় ভেবেছিল, তাওবার দরজা এতটাই দূরে যে আর ফিরতে হবে না। কিন্তু আল্লাহর সামনে দম্ভের কোনো ওজন নেই, আর গাফিলতির কোনো বাহানা শেষ বিচারের দিনে দাঁড়াতে পারে না। এই আয়াতের মধ্যে এক অদ্ভুত কোমল কঠোরতা আছে: তুমি সবাইকে বদলাতে পারবে না, কিন্তু নিজের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে না। তুমি কারও হেদায়াতের মালিক নও, কিন্তু কল্যাণের কথা পৌঁছে দেওয়ার আমানতদার তো বটেই।
তাই আজকের হৃদয় যদি একটু নরম হয়, তাকে ফিরিয়ে দাও। যদি অহংকার জমে থাকে, তাকে ভেঙে দাও। যদি মনে হয় অন্যরা বদলাবে না, তবু নিজের জন্য, নিজের রবের জন্য, এই আশায় যে একটি উপদেশ কোনো একদিন কোনো এক অন্তরে তাকওয়ার বীজ হয়ে উঠতে পারে—সেই কথা বলে যাও। কারণ শেষ পর্যন্ত আখিরাতে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে: তুমি কি সত্য বলেছিলে? তুমি কি কল্যাণ চেয়েছিলে? তুমি কি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডেকেছিলে, নাকি নীরবতার আরাম বেছে নিয়েছিলে?