ফেরাউনের দরবারে এক ভয়াবহ মুহূর্ত। সত্য সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, আর ক্ষমতা নিজের মুখ রক্ষার জন্য সঙ্গে সঙ্গে একটা নাম খুঁজে পেয়েছে: যাদুকর। কুরআন বলছে, ফেরাউনের সাঙ্গ-পাঙ্গরা বলল, নিশ্চয়ই এ লোকটি বিজ্ঞ-যাদুকর। এই একটি বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে বাতিলের পুরোনো অভ্যাস—সত্যের আলোকে দেখার আগেই তাকে অপবাদ দিয়ে ঢেকে দেওয়া। যখন হৃদয় হিদায়াতের জন্য খোলা না থাকে, তখন নিদর্শনও দোষ হয়ে যায়, মুজিজাও অপবাদে পরিণত হয়, আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা হক মানুষের অহংকারের দেয়ালে ঠেকে ফের।
এখানে কোনো নির্ভরযোগ্য পৃথক শানে নুযূলের কথা বলা হয় না; বরং এটি মূসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে ফেরাউনের সংঘাতের বৃহত্তর ঐতিহাসিক ও কুরআনিক ধারাবাহিকতার অংশ। ফেরাউন কেবল এক ব্যক্তি ছিল না, সে ছিল একটি জুলুম-ব্যবস্থার প্রতীক—যেখানে সত্যের সামনে মাথা নত করা মানে ছিল ক্ষমতার মসনদ কাঁপিয়ে তোলা। তাই তার দরবারের লোকেরা মূসার বার্তাকে বুঝতে চেষ্টা করেনি; তারা তাকে ব্যাখ্যা করার আগেই শ্রেণিবিন্যাস করেছে, নাম দিয়েছে, ভয় ছড়িয়েছে। আজও বাতিল প্রায় একই কায়দায় চলে: সত্যকে দল, ভিড়, প্রভাব, ভাষণ বা কৌশলের মোড়কে বন্দি করতে চায়, যেন হককে হক হিসেবে দেখা না লাগে।
এই আয়াত আমাদের অন্তরকে প্রশ্ন করে: আমি কি সত্যের সামনে দাঁড়ালে বিনয়ের মানুষ, না অস্বস্তি ঢাকতে অপবাদ বানানো মানুষ? কুরআনের এই দৃশ্য শুধু অতীতের নয়; এটি প্রতিটি যুগের দরবার, প্রতিটি সমাজের অহংকার, প্রতিটি হৃদয়ের পরীক্ষা। আল্লাহর নিদর্শন যখন সামনে আসে, তখন মুমিনের কাজ প্রতিরোধ নয়, স্বীকৃতি; জেদ নয়, সিজদা; আত্মরক্ষা নয়, আত্মসমর্পণ। ফেরাউনের লোকেরা মূসাকে যাদুকর বলেছিল, কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে—যে কথা তারা মুছে দিতে চেয়েছিল, সেটিই সত্য হয়ে টিকে গেছে, আর তাদের গর্ব ধ্বংসের ধুলোয় মিশে গেছে।
ফেরাউনের দরবারে সত্য এসে দাঁড়াতেই ক্ষমতা প্রথমে তলোয়ার তোলে না, তোলে ভাষা। তারা মূসা আলাইহিস সালামের নিদর্শনকে দেখে, কিন্তু দেখার সঙ্গে সঙ্গেই তার অর্থকে বিকৃত করে ফেলে; বলে, তিনি নাকি বিজ্ঞ-যাদুকর। এ এক পুরোনো বাতিল-নীতি: হকের সামনে মাথা নত করার বদলে হককেই সন্দেহের কাঠগড়ায় তোলা। যখন অহংকার মানুষের ভেতর বাসা বাঁধে, তখন আল্লাহর নিদর্শনও তার কাছে প্রমাণ নয়, হুমকি হয়ে ওঠে। সে সত্যকে বোঝে না, বরং সত্যের নাম বদলে দিয়ে নিজের অন্তরের অন্ধকারকে বাঁচাতে চায়।
তাই এই আয়াত শুধু অতীতের এক দরবারের সংবাদ নয়; এটি আমাদের অন্তরের আয়না। আমি কি কখনো নিজের স্বার্থ, অভ্যাস, বা সামাজিক অবস্থানের কারণে সত্যকে ‘অন্য কিছু’ বলে এড়িয়ে যাই? আমি কি এমন হই না, যে আমার কাছে আল্লাহর কথা এসে পৌঁছালেও তার সামনে বিনয়ী হওয়ার বদলে ব্যাখ্যার ধুলো ছড়িয়ে দিই? হিদায়াত সেই হৃদয়েই নামে, যা নিজের ভেতরের ফেরাউনকে চিনতে পারে এবং তার মুকুট খুলে দেয়। যারা আল্লাহর হককে চেনে, তারা জানে—নিদর্শনকে অপবাদ দেওয়া যায়, কিন্তু নিদর্শনের আলোকে নিভিয়ে দেওয়া যায় না; কারণ الحق শেষ পর্যন্ত নিজেরই ভাষায় কথা বলে, আর বাতিল কেবল ক্ষণিকের জন্যই চিৎকার করতে পারে।
ফেরাউনের দরবারে সত্য এসে দাঁড়ালে প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল উপলব্ধি নয়, ছিল রক্ষা-কবচের খোঁজ। সাঙ্গ-পাঙ্গরা তড়িঘড়ি বলে উঠল, এ তো বিজ্ঞ-যাদুকর। কুরআনের এই বাক্য আমাদের শেখায়, বাতিল অনেক সময় সরাসরি সত্যকে খণ্ডন করতে পারে না; তাই তাকে অপবাদ দেয়, তার আলোকে কুয়াশার নাম দেয়, তার মুজিজাকে কৌশল বলে উড়িয়ে দিতে চায়। যখন হৃদয় জেগে ওঠে না, তখন চোখের সামনে আল্লাহর নিদর্শনও সন্দেহের খাঁচায় বন্দি হয়ে যায়।
এখানে শুধু ফেরাউনের যুগের কথা নয়, মানুষের ভিতরের এক পুরনো রোগের কথাও আছে। অহংকার এমন এক পর্দা, যা সত্যকে দেখলেও মানতে দেয় না; ক্ষমতা, অভ্যাস, সমাজচাপ, দলীয় স্বার্থ—সব মিলিয়ে মানুষ কখনো নিজেকেই প্রতারণা করে। তাই মূসা আলাইহিস সালামের সত্যের মুখে যারা দাঁড়িয়েছিল, তারা মূলত নিজেদের অন্তরের ভীতিকে রক্ষা করছিল। কুরআন যেন বলছে, হে মানুষ, তোমার ভেতরে কি এমন কোনো ফেরাউন বাস করে না, যে হক আসলে তাকে অপমান ভেবে আঁতকে ওঠে?
এই আয়াতের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদেরও জিজ্ঞেস করতে হয়: আমি কি হককে সত্যিই হক হিসেবে গ্রহণ করি, নাকি আমার পছন্দ-অপছন্দই আমার ঈমানের মাপকাঠি? আল্লাহর দিক থেকে আসা নিদর্শন কখনো তামাশা নয়, আর নবীদের দাওয়াত কখনো বাতিলের ভাষ্যে বন্দি হয় না। ভয়ও দরকার, কিন্তু সেই ভয় যেন হয় আল্লাহকে অমান্য করার ভয়; আশা-ও দরকার, কিন্তু সেই আশা যেন হয় তাওবার দরজা খোলা থাকার আশা। ফেরাউনের দরবারে যেমন সত্যকে যাদু বলা হয়েছিল, তেমনি আমাদের অন্তরেও বহুবার হককে এভাবে নাম দিতে চায় নফস। কিন্তু যে হৃদয় কিয়ামতের আগে জেগে ওঠে, সে জানে—অবশেষে ফিরে যেতে হবে আল্লাহরই কাছে, আর সেদিন অপবাদ নয়, সত্যই কথা বলবে।
এই আয়াত আমাদেরও দাঁড় করিয়ে দেয় এক নির্দয় আয়নার সামনে। অনেক সময় আমরাও সত্য শুনি, কিন্তু তাওবাহ করি না; বুঝি, কিন্তু মাথা নত করি না; নিদর্শন দেখি, কিন্তু অন্তরের দরজা খুলি না। তখন হৃদয়ও ফেরাউনের দরবারের মতো হয়ে যায়—সেখানে যুক্তি থাকে, অহংকার থাকে, আত্মপক্ষ সমর্থন থাকে; কিন্তু ইনসাফের জন্য জায়গা থাকে না। আর যে হৃদয়ে ইনসাফ নেই, সেখানে হিদায়াত এসে পৌঁছালেও তাকে অলৌকিক বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়।
হে আল্লাহ, আমাদের এমন হৃদয় দান করুন যা সত্যকে ভয় পায় না, বরং সত্যের সামনে কেঁপে ওঠে; এমন আত্মা দান করুন যা অপবাদ দিতে দ্রুত নয়, বরং স্বীকার করতে লজ্জা পায়; এমন ঈমান দান করুন যা নিদর্শন দেখে অবাক হয়, কিন্তু অবাধ্য হয়ে থাকে না। ফেরাউনের লোকেরা সত্যকে যাদু বলেছিল, আর আমরা যেন নিজের নফসকে সত্যের বিচারক বানিয়ে না ফেলি। কারণ শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখে অপবাদ নয়, বিনয়ের সে কান্না, যা আল্লাহর দরবারে ঝরে পড়ে।